রংপুর বিভাগের দিনাজপুর, নীলফামারী ও রংপুর জেলার কৃষি অর্থনীতি চাঙ্গা করতে ১ হাজার ৪৫২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে তিস্তা সেচ ক্যানেল সংস্কার ও সম্প্রসারণের মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। প্রকল্পের ৯০ শতাংশ কাজ শেষের দাবি করা হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
পদে পদে অনিয়ম, আর নিম্নমানের কাজে অতিষ্ঠ খোদ কৃষকরা। প্রকল্পের নামে লাখ লাখ গাছ কাটা ও কৃষিজমির টপসয়েল সরানোর মতো কাজে ভোগান্তিতেও পড়েছেন স্থানীয়রা। এত বিশাল বাজেটের প্রকৃত সুফল যেন প্রান্তিক চাষির দোরগোড়ায় পৌঁছায়, সেজন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ের কঠোর ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করছেন ভুক্তভোগী কৃষকরা।
যা আছে তিস্তা সেচ প্রকল্পে
তিস্তাসেচ ক্যানেল যেসব এলাকার মধ্য দিয়ে গেছে সেগুলো ‘কমান্ড এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত। ২০২১ সালে কমান্ড এলাকার সংস্কার ও সম্প্রসারণ প্রকল্প হাতে নেয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ২০২২ সালের এপ্রিলে চূড়ান্ত হয় এ প্রকল্পের রূপরেখা। ১ হাজার ৪৫২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা বরাদ্দের পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় পাউবো।
‘কোটি কোটি টাকা খরচ করে সরকারের এই প্রকল্প দিয়ে আমাদের কী লাভ হলো, যদি নিজেদের টাকাই খরচ করতে হয়? বছরের পর বছর এসব নালায় পানি আসে না।’
তিস্তা ব্যারাজ থেকে শুরু হয়ে সেচ প্রকল্পের খাল নীলফামারীর ডিমলা, জলঢাকা, কিশোরগঞ্জ, সৈয়দপুর ও সদর; রংপুরের গঙ্গাচড়া, তারাগঞ্জ, বদরগঞ্জ এবং দিনাজপুরের খানসামা ও চিরিরবন্দর মিলিয়ে মোট ৭৬৬ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। প্রকল্পের আওতায় এই পুরো অংশের পাড় শক্তিশালীকরণ করার কথা। এছাড়া ৭২ কিলোমিটারে সেচ পাইপ, পাড় রক্ষায় ১০ দশমিক ০৮ কিলোমিটারে কংক্রিটের ব্লক বসানো, ৭ দশমিক ১৩ কিলোমিটার বাইপাস সেচখাল নির্মাণ, ২৭টি কালভার্ট নির্মাণ, ২৭০ হেক্টরে জলাধার পুনঃখনন, সাড়ে ৯ কিলোমিটার নালা পুনঃখনন, ৫২ কিলোমিটার পরিদর্শন রাস্তা মেরামত, ২০টি রেগুলেটর নির্মাণ ও ৮৭ হাজারের বেশি গাছ রোপণের কথা রয়েছে।
সেচ ক্যানেলে পানি দিতে গিয়ে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা ব্যারাজের ভাটির প্রবাহ সম্পূর্ণ আটকে দেওয়ায় ব্রহ্মপুত্রের মোহনা পর্যন্ত ৯০ কিলোমিটার নদীপথ এখন পানিশূন্য মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।
নদী অধিকারকর্মীদের দাবি, শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় যেখানে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ৫ হাজার কিউসেক থাকার কথা, সেখানে উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে কোনো কোনো সময় তা মাত্র ৪০০ কিউসেকে নেমে আসে। এই তীব্র পানি সংকটের মূল সমাধান না করে ৩৫ বছর আগের (নব্বইয়ের দশকে) পুরোনো সমীক্ষাকে পুঁজি করে শুধু খালের অবকাঠামো উন্নয়নে এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা অর্থের অপচয় ছাড়া কিছু নয়।
সরকারি ক্যানেলে পানি ওঠে ব্যক্তিগত খরচে
সরেজমিনে নীলফামারীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকরা নিজস্ব অর্থায়নে ক্যানেলের ধারে গভীর নলকূপ ও ব্যক্তিগত সেচপাম্প বসিয়ে পানি তুলছেন শুকনো তিস্তা সেচ নালায়। লক্ষ্য সেই পানি যেন ক্যানেলের মাধ্যমে কোনোমতে দূরের ফসলি জমিতে পৌঁছায়।
‘খরচ বাঁচাতে নালার তলদেশ ও পাশের ফসলি জমির উর্বর মাটি কেটে ক্যানেলের পাড়ে দিচ্ছে। এতে একদিকে আবাদি জমি নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ক্যানেলের বাঁধগুলো নরম ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সামান্য পানির চাপেই ভেঙে পড়ছে।’
নীলফামারী সদরের সেচ ক্যানেল এলাকার কৃষক রফিকুল ইসলাম, জয়নাল, আলমগীর হোসেনসহ অন্তত ২০ জন চাষি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘কোটি কোটি টাকা খরচ করে সরকারের এই প্রকল্প দিয়ে আমাদের কী লাভ হলো, যদি নিজেদের টাকাই খরচ করতে হয়? বছরের পর বছর এসব নালায় পানি আসে না।’
জলঢাকা ও ডিমলা এলাকার কৃষকরা জানান, গত বছর খালের যে অংশ সিসি ঢালাই করা হয়েছিল, পানি আসার আগেই তা ধসে পড়েছে। এছাড়া কারিগরি ও প্রকৌশলগত ত্রুটির কারণে বেশিরভাগ এলাকায় সংস্কার করা সেচনালা বা খালের তলদেশ আশপাশের ফসলি জমির চেয়ে অনেক নিচু হয়ে গেছে। ফলে অনেক ক্যানেলে পানি থাকলেও তা আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে জমিতে পৌঁছাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে কৃষকরা নিজেদের পাম্পের পানি নালায় ফেলে জমি বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।
তাদের ভাষ্যমতে, কিছু নালার কাঠামো এতটাই দুর্বল যে পানি ছাড়লে উপকারের চেয়ে উল্টো বাঁধ ভেঙে জমি তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি।
কৃষক ও নদীবিষয়ক সংগঠনের নেতারা বলছেন, মাত্র এক-দেড় বছর আগে মূল খালের যেসব শাখা সংস্কার করা হয়েছিল, পানির অভাবে সেগুলোর অনেক অংশ এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
খেসারত দিচ্ছে টপসয়েল
২০২২ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪-এ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় তা বাড়ানো হয়েছে ২০২৬ পর্যন্ত। দরপত্র অনুযায়ী, ক্যানেলের পাড় মজবুত ও টেকসই করার জন্য বাইরে থেকে ট্রাকে করে মাটি এনে ভরাট করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো খরচ বাঁচাতে খালের তলদেশ এবং পাশের আবাদি জমির উর্বর উপরিভাগের মাটি (টপসয়েল) কেটেই পাড় বাঁধানোর কাজ চালাচ্ছে।
কিশোরগঞ্জ সেচ প্রকল্প এলাকার বাসিন্দা বুলবুল আহমেদ ও আব্দুল মজিদসহ অন্তত ১০ জন অভিযোগ করেন, ঠিকাদারের লোকজন খরচ বাঁচাতে নালার তলদেশ ও পাশের ফসলি জমির উর্বর মাটি কেটে ক্যানেলের পাড়ে দিচ্ছে। এতে একদিকে আবাদি জমি নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ক্যানেলের বাঁধগুলো নরম ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সামান্য পানির চাপেই ভেঙে পড়ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে তারা গ্রামবাসী মিলে ক্যানেল পাড়ে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ করেছিলেন। কিন্তু এর জেরে ঠিকাদার ও পাউবোর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এসে উল্টো তাদের ওপর চড়াও হন এবং হামলার ঘটনা ঘটে।
সিসি ঢালাইয়ে অনিয়ম
ক্যানেল টেকসই করতে যে সিসি ঢালাই ও কার্পেটিং করা হয়েছে, তা অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে তৈরি হওয়ায় নির্মাণের কয়েক মাসের মধ্যেই ভেঙে ধসে পড়ছে।
এছাড়া ক্যানেলের তলদেশ ও পাড় রক্ষায় যেখানে নিয়ম অনুযায়ী টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী জিওব্যাগ ফেলার কথা, সেখানে ব্যয় কমাতে ফেলা হয়েছে অত্যন্ত নিম্নমানের সাধারণ চটের বস্তা, যা অল্প দিনেই পচে ধসে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, পাউবোর কিছু কর্মকর্তার তদারকির অভাবেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো এই অনিয়ম করার সুযোগ পেয়েছে।
পরিবেশের মহাবিপর্যয়
প্রকল্পের নথিপত্রে যেখানে নতুন করে গাছ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা দেখিয়ে পরিবেশ সুরক্ষার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই সেচ ক্যানেল সংস্কার ও সম্প্রসারণ করতে গিয়ে ক্যানেলের দুই ধারের প্রায় ৪ লাখ পরিণত ও অপরিণত গাছ কেটে সাবাড় করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
কয়েক দশক ধরে ক্যানেলের পাড় বাঁধিয়ে রাখা এসব গাছ কাটার ফলে পুরো উত্তরবঙ্গের পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। বিশাল সংখ্যক এই বৃক্ষনিধনের কারণে ক্যানেলের দুই ধারের মাটি আলগা হয়ে গেছে, যা বাঁধ ধসে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।
‘২০১৪ সাল থেকে উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহারের পর এখন যে সামান্য পানি আসে, তা-ও আটকে দিয়ে ভাটির ৯০ কিলোমিটার নদীকে মরুভূমি বানানো হচ্ছে। নদী মেরে সেচ প্রকল্পের এই পরিধি বাড়ানো কোনোভাবেই পরিবেশবান্ধব বা বৈজ্ঞানিক নয়।’
তাদের অভিযোগ, ক্যানোপি বা ছায়া দেওয়া এই গাছগুলো কাটার ফলে এই অঞ্চলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় জীববৈচিত্র্য পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে রিভারাইন পিপলের পরিচালক অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, প্রথম ধাপে ১ লাখ ১০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও পানির অভাবে তা কখনোই পূরণ হয়নি। ২০১৪ সাল থেকে উজানে একতরফা পানি প্রত্যাহারের পর এখন যে সামান্য পানি আসে, তা-ও আটকে দিয়ে ভাটির ৯০ কিলোমিটার নদীকে মরুভূমি বানানো হচ্ছে। নদী মেরে সেচ প্রকল্পের এই পরিধি বাড়ানো কোনোভাবেই পরিবেশবান্ধব বা বৈজ্ঞানিক নয়।
তিনি আরও বলেন, আমরা যদি জাতিসংঘে ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের প্রতিকার চাই, তাহলে তারাও প্রশ্ন তুলবে বাংলাদেশ নিজের অংশের ১১৫ কিলোমিটার নদীকে কতটা বাঁচিয়ে রেখেছে? নদীকে মেরে দেড় হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পের সুফল ও আয়-ব্যয়ের হিসাব করা এখন সময়ের দাবি। খাল খননের নামে রাস্তাঘাট ও গাছ কেটে যে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয়েছে, তার জবাবদিহিতা থাকা উচিত।
নদীভাঙন প্রসঙ্গ টেনে এই গবেষক বলেন, মাত্র ২০০-৩০০ কোটি টাকা খরচ করলে এই অঞ্চলের তীব্র নদীভাঙন বন্ধ করা যেত। অথচ মানুষের ঘরবাড়ি রক্ষার উদ্যোগ না নিয়ে, নদীকে মেরে সেচ খালের পরিধি বাড়ানোর পেছনে এত টাকা খরচ করা এক ধরনের অপরিণামদর্শী পরিকল্পনা।
অনিয়মের এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্মকর্তাদের বক্তব্য চিরাচরিত। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী এবং সৈয়দপুর পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখিনুজ্জামান জানান, নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় কাজে অনিয়ম বা ত্রুটির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে অবশ্যই ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে স্থানীয়দের ওপর হামলা বা ৪ লাখ গাছ কাটার ফলে পরিবেশগত ক্ষতির সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের কোনো সদুত্তর তারা দিতে পারেননি।
এদিকে ক্যানেল সংস্কারে খালের তলদেশ ও আবাদি জমির মাটি কাটা, সিসি ঢালাইয়ে নিম্নমানের সামগ্রী, জিও ব্যাগের পরিবর্তে চটের বস্তা ব্যবহার ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে জানতে পাউবোর রংপুর বিভাগীয় অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মোহা. সরফরাজ বান্দার মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।