দেশত্যাগের প্রায় দুই বছর পর এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে চলতি বছরেই বাংলাদেশে ফেরার জোরালো ঘোষণা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি-কে দেওয়া একটি এক্সক্লুসিভ ইমেইল সাক্ষাৎকারে তিনি এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। একই সাথে তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর যেকোনো ধরনের হামলা মূলত দেশের স্বাধীনতার ওপরই আঘাত।
পিতার হাত ধরে স্বাধীন হওয়া দেশ থেকে বিতাড়িত হওয়া, দেশে মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা—সব মিলিয়ে এক চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েও শেখ হাসিনা মার্কিন জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থারের বিখ্যাত উক্তির সুর ধরে বলেন, “আমি চলতি বছরেই দেশে ফিরব।” তাঁর মতে, আওয়ামী লীগ কেবল কোনো কাগজের সংগঠন নয়, এটি একটি “শক্তি”। গত ২৩ জুন দেশজুড়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের মধ্যেই দলটির ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি দলের এই সাংগঠনিক ভিত্তি ও টিকে থাকার ক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন।
সাক্ষাৎকারে আদালতের মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং তাঁর দেশে ফেরার বাস্তবতা নিয়ে জানতে চাওয়া হলে শেখ হাসিনা বলেন, “আমার দেশে ফেরা কোনো ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার, আইনের শাসন এবং আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষার এক বৃহত্তর লড়াইয়ের সাথে জড়িত। আমি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি না। আমি রাজনীতি করি বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণ এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘সোনার বাংলা’র স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য।”
আদালতের রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যে রায় দেওয়া হয়েছে তা কোনো বিচার নয়। এটি একটি অবৈধ, অসাংবিধানিক এবং সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক প্রক্রিয়া। আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বহীন করার জন্য বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর আগেও এমন চেষ্টা করা হয়েছে, যা অতীতে ব্যর্থ হয়েছে এবং এবারও ব্যর্থ হবে।”
মৃত্যুভয়কে উপেক্ষা করে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। ১৯৭৫ সালে আমি আমার বাবা-মা, ভাই এবং প্রায় পুরো পরিবারকে হারিয়েছি। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়ে আমাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। আমার বিরুদ্ধে বহু ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু সব ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে আমি সবসময় বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। জনগণের ভোটে পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে দেশের অভূতপূর্ব উন্নয়নের জন্য কাজ করেছি। আমার পুরো জীবনটাই বাংলাদেশের মানুষ, আওয়ামী লীগ, গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং দেশের উন্নয়নের সাথে মিশে আছে। তাই আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই—সব বাধা ও ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে আমি চলতি বছরেই আমার দেশে ফিরে আসব।”
বর্তমান সরকারের নানা সীমাবদ্ধতার সুযোগে আওয়ামী লীগ আবার জনসমর্থন ফিরে পাচ্ছে কি না এবং দলটির সেই সাংগঠনিক শক্তি আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি দলের দীর্ঘ ইতিহাস টেনে বলেন, “আওয়ামী লীগ কোনো কাগজের সংগঠন নয়। এটি বাংলার মাটি, বাংলার মানুষ, বাংলার ইতিহাস এবং বাঙালি জাতির পরিচয়ের গভীরে প্রোথিত একটি রাজনৈতিক শক্তি। এর ৭৭ বছরের দীর্ঘ পথচলায় আওয়ামী লীগ বহুবার আক্রান্ত হয়েছে, রক্ত দিয়েছে এবং বহুবার নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে। কিন্তু প্রতিবারই জনগণের শক্তিতে ভর করে এই দল আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।”