ঢাকার তুরাগ নদ থেকে দুই দিনে তিন জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এর মধ্যে দুজন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
যে তিন জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে তারা হলেন- তুরাগ থানার রানাভোলা এলাকার মো. শাহ আলমের ছেলে মো. সুমন (১৭), একই এলাকার আরিফ হাসান রাকিব (২৫) ও রাজধানীর মনিপুর মোল্লাপাড়ার বাসিন্দা কফিল উদ্দিন মোল্লার ছেলে রনি মোল্লা (৩৫)।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মো. সুমন ২২ জুন বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকে নিখোঁজ ছিল। শুক্রবার তুরাগ নদ থেকে তার অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে আশুলিয়া থানা পুলিশ।
সুমনের বাবা-মা বাকরুদ্ধ
শনিবার দুপুরে রানাভোলা এলাকায় সুমনের ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখা যায়, সুমনের বাবা মো. শাহ আলম, মা ও বোন বসে আছেন দুই কক্ষের বাসার একটি কক্ষে। ছেলেকে হারিয়ে বাবা-মা বাকরুদ্ধ। কথা বলতে গেলেও চুপ থাকেন তারা। সান্ত্বনা দেওয়ার পর কথা বলেন। তবে অধিকাংশ প্রশ্নে চুপ থাকেন। সুমন ২২ তারিখ থেকে নিখোঁজ ছিল কিনা, এমন প্রশ্নের কোনও উত্তর দেননি বাবা।
এ সময় আত্মীয়-স্বজনরা কোনও কিছু জিজ্ঞেস না করতে অনুরোধ করেন। নিখোঁজ ছিল, এতটুকু উত্তর দিয়ে তারা জানান, শুক্রবার খবর পেয়ে তারা লাশ নিয়ে আসেন। মোবাইল থেকে সুমনের সব ছবি ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে। বাসায় থাকা ছবিগুলোও ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। সুমনের মোবাইল ভেঙে ফেলা হয়েছে। সন্তান হারানোয় মানসিক যন্ত্রণা বাড়বে, তাই কোনও স্মৃতি রাখা হয়নি।
একপর্যায়ে ফেসবুকে সুমন আহমেদ চৌধুরী (ইংরেজিতে) নামের একটি আইডি দেখানো হলে সেটি সুমনের বলে নিশ্চিত করেন পরিবারের সদস্য ও কয়েকজন প্রতিবেশী। সুমন কামারপাড়া আড়তে কাঁচামালের ব্যবসা করত বলে জানান তারা। ফেসবুক আইডি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ছয় দিন আগে সর্বশেষ আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে একটি শোভাযাত্রার ভিডিও আপলোড করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় দলীয় কার্যক্রমের ভিডিও আপলোড করা হয়।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা স্থানীয়দের কাছ থেকে সংবাদ পেয়ে ২৫ জুন দিবাগত রাতে আশুলিয়া বাজারের পাশে তুরাগ নদের পাশের এক চক থেকে একজনের মরদেহ উদ্ধার করি। পরে নিহত ব্যক্তির পরিবার মরদেহটি সুমনের বলে শনাক্ত করে। গতকাল এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তির বড় ভাই অপমৃত্যুর মামলা করেছেন। নিহতের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন ২২ জুন পিকনিকের কথা বলে সুমন বাসা থেকে বের হয়। পরে তুরাগ নদে পড়ে যায়। সে সাঁতার জানতো না। পরিবারের সদস্যরা নদে খোঁজাখুঁজি করেছেন। নদে একটি লাশের কথাই আমরা জানি। আর অন্যান্য যেসব কথাবার্তা আসতেছে, ওগুলোর বিষয়ে আমাদের জানা নাই।’
একই দিন নিখোঁজ হন আরিফ
আরিফের চাচা মো. আরশাদুল ইসলাম বলেন, ‘২২ জুন বেলা ১১টার দিকে বাসা থেকে বের হয়ে যায় আরিফ। ওই দিন বিকাল ৪টার একটু আগে মোবাইলে মায়ের সঙ্গে কথা হয়েছিল তার। এরপর থেকে নিখোঁজ ছিল। গত বুধবার তুরাগ নদ থেকে তার লাশ উদ্ধার হয়। সে যে রাজনীতি (আওয়ামী লীগের) করতো আমরা জানতাম না। মৃত্যুর পর কয়েকজন ভিডিও-ছবি দেখানোর পর জানছি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা। আমরা জানি না কীভাবে মারা গেছে। সাঁতার খুব একটা ভালো পারতো না আরিফ। লাশ উদ্ধারের পরও মামলা করতে চাইনি। কিন্তু থানা পুলিশের একটা নিয়মের মধ্য দিয়ে যেতে হয় তাই মামলা করছি। বৃহস্পতিবার গ্রামের বাড়ি রংপুরে লাশ দাফন করা হয়েছে।’
রনির বাবা কফিল উদ্দিন মোল্লা বলেন, ‘উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকায় একটি হোটেলে কাজ করতো রনি। ২৪ জুন রনির মৃত্যুর খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে জানতে পারি গোসল করার সময় মারা গেছে। হোটেলের লোকজন জানিয়েছেন, ওই দিন সকালে রনি হোটেল থেকে বের হয়েছিল। তার মানসিক একটু সমস্যা ছিল, যখন মন চাইতো এদিক-সেদিক চলে যেতো। কোনও দলের রাজনীতির সঙ্গে কখনোই জড়িত ছিল না।’
তুরাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘তুরাগ নদের আশুলিয়া থানা এলাকা থেকে ২২ জুনের পর একটি লাশ উদ্ধার হয়েছে। ওই দিন মিছিল হয়েছিল, বেশ কিছু আসামি গ্রেফতারও করা হয়েছিল, সবই হয়েছে আশুলিয়া থানা এলাকায়। তবে কারও মৃত্যুর কথা আমার জানা নেই।’