জাতীয় | সংবাদ পোস্ট
ঢাকা, ২২ অক্টোবর ২০২৬: সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও আহত মানুষের সংখ্যা কমানো, ট্রাফিক আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বানের মধ্য দিয়ে আজ বৃহস্পতিবার পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘নিরাপদ সড়ক, সমৃদ্ধ দেশ—সবার আগে বাংলাদেশ’। সড়ক নিরাপত্তাকে জাতীয় উন্নয়ন ও জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই এবারের প্রতিপাদ্যের মূল বার্তা।
প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় অসংখ্য মানুষের মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনা পরিবার, সমাজ এবং অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। তাই শুধু দিবস পালন বা সচেতনতামূলক প্রচার নয়, দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সড়ক নিরাপত্তা জোরদারে সরকার ইতোমধ্যে ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন, ২০২৬’-এর একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ও এনটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত আইনে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের বিনামূল্যে জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করা, দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে সহায়তাকারীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের জন্য ডিমেরিট পয়েন্ট চালু এবং পুনরায় আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দ্বিগুণ জরিমানার বিধান রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ প্রণীত খসড়াটির লক্ষ্য হলো দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা, যানবাহন ও সড়ক অবকাঠামোর নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য সমন্বিত আইনি কাঠামো গড়ে তোলা। তবে এসব বিধান এখনো প্রস্তাবিত খসড়ার অংশ; চূড়ান্ত আইন হিসেবে কার্যকর হয়েছে—এমন দাবি করা যাচ্ছে না।
গত ১৪ অক্টোবর সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ২০২৭ সালের মধ্যে একটি সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নে সরকারের অঙ্গীকারের কথা জানান।
এর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মরক্কোর মারাকেশে অনুষ্ঠিত সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক আন্তর্জাতিক মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে বাংলাদেশ ২০২৭ সালের মধ্যে বৈশ্বিক ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি সমন্বিত আইন প্রণয়নের অঙ্গীকার করে। এ পদ্ধতিতে চালক বা পথচারীর ভুলের সম্ভাবনা বিবেচনায় রেখে সড়ক, যানবাহন, গতি নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্ঘটনার পর জরুরি সেবাসহ পুরো ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় আনুমানিক ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ৪৯০ জন নিহত হয়েছেন।
দুটি হিসাবের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার তথ্য সংগ্রহ, প্রতিবেদন তৈরির পদ্ধতি ও দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর হিসাব নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় পার্থক্য থাকলে পরিসংখ্যানেও ব্যবধান দেখা দিতে পারে। তাই সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং নিয়মিত পরিসংখ্যান প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় ট্রাফিক আইন মেনে চলা, দায়িত্বশীলভাবে যানবাহন চালানো এবং নিরাপদ সড়ক গড়ে তুলতে সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বলে এনটিভির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে চালকের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা, নির্ধারিত গতিসীমা মেনে চলা, হেলমেট ও সিটবেল্ট ব্যবহার এবং ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ও মোড় চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা জরুরি। একই সঙ্গে পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পারাপারের ব্যবস্থা, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, পর্যাপ্ত সড়কবাতি স্থাপন এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত জরুরি চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে।
দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীর কাকরাইলে নিসচার কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে সকাল ১০টায় র্যালি শুরু হয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে গিয়ে শেষ হওয়ার কর্মসূচির কথা জানানো হয়েছে।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের প্রত্যাশা—আইনের কার্যকর প্রয়োগ, নিরাপদ অবকাঠামো, দায়িত্বশীল চালনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমিয়ে আনা। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; চালক, যাত্রী, পথচারী, পরিবহনমালিক ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মিলিত দায়িত্ব।
সূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), এনটিভি অনলাইন ও জাগো নিউজ২৪।