৮৫ বছর বয়সী পিল্লাই জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সাবেক বিচারক। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই, আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
নোবেল কমিটির মতে, আন্তর্জাতিক আইন ও আইনের শাসনকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে পিল্লাইয়ের অবদান বর্তমান বিশ্বে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। যুদ্ধ ও সংঘাতের সময়েও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে আন্তর্জাতিক আদালতে
দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত একটি পরিবারে জন্ম নাভি পিল্লাইয়ের। দেশটিতে বর্ণবৈষম্য চালু থাকার সময় তিনি আইন পেশায় যুক্ত হন। ১৯৬৭ সালে নাটাল অঞ্চলে আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করা প্রথম নারী ছিলেন তিনি।
বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় নেলসন ম্যান্ডেলা ও অন্যান্য অধিকারকর্মীদের পক্ষে আইনি লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন পিল্লাই। পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্ণবৈষম্যের অবসানের পর ওই আদালতে বিচারক হওয়া প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন তিনি।
তাঁর কর্মজীবনের পরিধি পরে জাতীয় আদালত ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় বিস্তৃত হয়। রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এসব প্রতিষ্ঠানে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে তাঁর ভূমিকা আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিতি পায়।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ছিলেন ছয় বছর
২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন নাভি পিল্লাই। এ সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানবাধিকার পরিস্থিতি, সংঘাতের শিকার মানুষের সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার বিষয়ে কাজ করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক অপরাধের তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় যৌন সহিংসতাকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। রুয়ান্ডার গণহত্যাসংক্রান্ত মামলাগুলোতে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার অংশ হিসেবে বিবেচনার আইনি অগ্রগতিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
নোবেল কমিটি মনে করে, অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা এবং রাষ্ট্র ও ক্ষমতাধর ব্যক্তিদেরও আইনের আওতায় আনার ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন অবদান রেখেছে।
গাজা নিয়ে জাতিসংঘের তদন্তেও ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায়
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফিলিস্তিনের অধিকৃত ভূখণ্ড নিয়ে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দিয়েছেন পিল্লাই। কমিশন গত বছর গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ইসরায়েল ওই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
এ বিষয়ে পিল্লাইয়ের ভূমিকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার পাশাপাশি বিতর্কও তৈরি করেছে। নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণার পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে। অন্যদিকে মানবাধিকারকর্মী ও আন্তর্জাতিক আইনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁর দীর্ঘদিনের কাজের প্রশংসা করেছেন।
তবে নোবেল কমিটির ঘোষণায় শুধু গাজা নিয়ে তাঁর কাজ নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারে দীর্ঘদিনের অবদানকে পুরস্কারের মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন চাপে, বলছে নোবেল কমিটি
বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে—এমন প্রেক্ষাপটে পিল্লাইকে পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্তকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে নোবেল কমিটি।
কমিটির বক্তব্য অনুযায়ী, শক্তিশালী রাষ্ট্র বা ব্যক্তির ক্ষমতার চেয়ে আইন ও ন্যায়বিচারকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। আন্তর্জাতিক আইন কার্যকর না থাকলে সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধান, অপরাধের বিচার এবং নির্যাতনের শিকার মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
পিল্লাই বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগসংক্রান্ত মামলায় বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি আবারও বৈশ্বিক আলোচনায় এসেছে।
১০ ডিসেম্বর দেওয়া হবে পুরস্কার
নোবেল শান্তি পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা, যা আনুমানিক ১২ লাখ মার্কিন ডলারের সমান। আগামী ১০ ডিসেম্বর নরওয়ের অসলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে পিল্লাইয়ের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে।
নেলসন ম্যান্ডেলা, এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্ক, ডেসমন্ড টুটু ও আলবার্ট লুথুলির পর নাভি পিল্লাই শান্তিতে নোবেলজয়ী পঞ্চম দক্ষিণ আফ্রিকান হিসেবে পরিচিত হলেন।
তাঁর এই স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে সংঘাতের মধ্যে ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এবং আইনের শাসন রক্ষার প্রয়োজনীয়তাই এবারের পুরস্কারের মাধ্যমে সামনে এসেছে।