ঢাকা: ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বর্ণনায় পরিবর্তন আনছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। নতুন পাঠ্যবইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা কীভাবে দেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে নতুন বর্ণনা যুক্ত করা হচ্ছে। এর ফলে বিভিন্ন সরকারের সময়ে প্রণীত পাঠ্যবইয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার বিবরণে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যবহৃত পাঠ্যবই, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংশোধিত পাঠ্যবই এবং ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রস্তুত করা নতুন পাঠ্যবইয়ে স্বাধীনতার ঘোষণার বিবরণ এক নয়।
স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনায় কী পরিবর্তন আসছে?
২০২৭ সালের সপ্তম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের প্রথম অধ্যায় ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও গণ-আন্দোলন’-এ মুক্তিযুদ্ধের সূচনা এবং স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে নতুন বিবরণ রাখা হচ্ছে।
নতুন পাঠ্যবইয়ের বর্ণনায় বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার পর চট্টগ্রামে মেজর জিয়াউর রহমান বিদ্রোহ করেন। এরপর ২৬ মার্চ রাত ২টা ১৫ মিনিটে তিনি বাঙালি কর্মকর্তা ও সৈনিকদের একত্র করে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা দেন। পরবর্তী সময়ে কালুরঘাটের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ২৭ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পরে শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আরেকটি ঘোষণাও দেন বলে নতুন পাঠ্যবইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যবহৃত ২০২২ সালের সপ্তম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে বলা হয়েছিল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে, অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংশোধিত পাঠ্যবইয়ে বলা হয়েছিল, ২৬ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আবারও ঘোষণা দেন।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে যুক্ত হচ্ছে আরও বিষয়
স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনার পাশাপাশি ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্স, বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা এবং নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভূমিকা যুক্ত করা হচ্ছে।
এ ছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা একটি নিবন্ধও পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইতিহাসের বাইরেও শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন আসছে। চতুর্থ শ্রেণির জন্য ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও ‘খেলাধুলা’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দময় শিক্ষা’ নামে চারটি নতুন বই যুক্ত হচ্ছে।
প্রায় ৩১ কোটি বই ছাপানোর প্রস্তুতি
২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপানো হচ্ছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্যও বই রয়েছে। পাঠ্যবইয়ের পরিমার্জন শেষে মুদ্রণের কাজ চলছে এবং ইতিমধ্যে বেশ কিছু বই ছাপানো হয়েছে।
ইতিহাসের বর্ণনা নিয়ে গবেষকের মত
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গবেষক আফসান চৌধুরীর মতে, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে রাষ্ট্রের ইতিহাসের বর্ণনাতেও পরিবর্তন আসে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে অনেক সময় ইতিহাসের চেয়ে রাজনৈতিক চর্চা বেশি গুরুত্ব পায়। তিনি রাষ্ট্রের ইতিহাসের পাশাপাশি সমাজের ইতিহাস ও অপ্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস চর্চার ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই পাঠ্যবইয়ে এ-সংক্রান্ত তথ্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল, তথ্যের যথার্থতা এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: প্রথম আলো। প্রতিবেদন: ‘পাঠ্যবইয়ে স্বাধীনতা ঘোষণার বর্ণনা বদলাবে, এবার যেভাবে থাকছে’।