নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর গণমাধ্যম থেকে জানতে পারে বাংলাদেশ; মামলার নথি ও রায়ের অনুলিপি চেয়ে কূটনৈতিক পত্র পাঠিয়েছে জেদ্দা কনস্যুলেট
ঢাকা: সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে কিংবা পরে বাংলাদেশ দূতাবাস বা জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। ফলে সৌদি কর্তৃপক্ষের ঘোষণার বরাতে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পরই বিষয়টি জানতে পারে বাংলাদেশ। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তির মামলার বিস্তারিত তথ্য ও রায়ের অনুলিপি চেয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে কূটনৈতিক পত্র পাঠিয়েছে জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট।
বুধবার (২১ অক্টোবর) প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কনস্যুলেটের পাঠানো একটি গোপনীয় চিঠির তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। চিঠিটি ১৮ অক্টোবর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি হলেন নজরুল ইসলাম আবদুল বশির ও সুইটি আক্তার। সৌদি কর্তৃপক্ষের বিবৃতি অনুযায়ী, পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে মসজিদের পবিত্রতা লঙ্ঘনের অভিযোগে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
কনস্যুলেটের চিঠি অনুযায়ী, গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির বরাতে দেশটির গণমাধ্যমে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশিত হয়। এর আগে কিংবা পরে সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেনি বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
কনস্যুলেট জানিয়েছে, দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সৌদি কর্তৃপক্ষ সরবরাহ করেনি। ফলে তাঁদের বিচারপ্রক্রিয়া, আদালতের রায় এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন কারাগারে আটক বাংলাদেশিদের বিষয়ে তথ্য চেয়ে জেদ্দা কনস্যুলেট দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে অনুরোধ জানিয়েছিল। সেই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ সেপ্টেম্বর একটি তালিকা পাওয়া যায়।
ওই তালিকায় নজরুল ইসলাম আবদুল বশির ও সুইটি আক্তারের নাম ছিল। তবে তাঁদের সাজা বা মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে কোনো তথ্য উল্লেখ ছিল না বলে কনস্যুলেটের চিঠিতে জানানো হয়েছে।
তালিকা অনুযায়ী, তাঁরা সৌদি আরবের আল মাজাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। নজরুল ইসলামকে ২০২৩ সালের ১ আগস্ট তথ্যপ্রযুক্তিসংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগে আটক করা হয়। পরদিন ২ আগস্ট সুইটি আক্তারকে ব্যভিচারের অভিযোগে আটক করা হয়।
নজরুল ইসলাম জেদ্দা সংশোধনাগারে এবং সুইটি আক্তার জেদ্দার নারী কারাগারে আটক ছিলেন বলে তালিকায় উল্লেখ ছিল।
কনস্যুলেটের চিঠিতে বলা হয়েছে, আটক ব্যক্তিদের তালিকায় নজরুল ও সুইটির বিরুদ্ধে অভিযোগের উল্লেখ থাকলেও তাঁদের সাজা সম্পর্কে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, তথ্যপ্রযুক্তিসংক্রান্ত অপরাধ কিংবা ব্যভিচারের অভিযোগে কোনো বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের আগের নজির সম্পর্কে কনস্যুলেটের কাছে তথ্য ছিল না।
অন্যদিকে, সৌদি কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত বিবৃতিতে মক্কার একটি মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা বলা হয়েছে। আটক হওয়ার সময় তালিকায় উল্লেখিত অভিযোগ এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে প্রকাশিত অভিযোগের মধ্যে বিস্তারিত সম্পর্ক কী, তা স্পষ্ট করতে মামলার নথি প্রয়োজন।
তবে আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় ও বিচারপ্রক্রিয়ার নথি পাওয়া না পর্যন্ত অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ বা মৃত্যুদণ্ডের আইনি ভিত্তি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
ঘটনার বিস্তারিত জানতে জেদ্দা কনস্যুলেট সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মক্কা শাখায় একটি কূটনৈতিক পত্র পাঠিয়েছে। এতে দুই বাংলাদেশির মামলার বিস্তারিত তথ্য, বিচারপ্রক্রিয়া এবং আদালতের রায়ের অনুলিপি চাওয়া হয়েছে।
কনস্যুলেট জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় নথিপত্র পাওয়ার পর এ বিষয়ে পরবর্তী বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠানো হবে। ফলে মামলার পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পেতে সৌদি কর্তৃপক্ষের জবাবের অপেক্ষা করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।
কনস্যুলেটের চিঠিতে সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের কারাগারগুলোতে আটক অন্যান্য বাংলাদেশির তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন নৈতিকতাসংক্রান্ত মামলায় ৩০৬ জন বাংলাদেশির আটক থাকার তথ্য উল্লেখ রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৪৭ জনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডের সাজা হয়েছে বলে চিঠিতে জানানো হয়েছে।
সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কারাদণ্ডের মেয়াদ এক মাস থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত। তবে এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট কারাগারগুলোর আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে কনস্যুলেটের পাওয়া তালিকার ভিত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের প্রকৃত বিবরণ, বিচারপ্রক্রিয়া, আদালতের রায় এবং বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশনকে অবহিত না করার কারণ জানা।
রায়ের অনুলিপি ও সংশ্লিষ্ট নথি পাওয়ার পরই এ বিষয়ে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যেতে পারে। আপাতত সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো কূটনৈতিক পত্রের জবাব এবং কনস্যুলেটের পরবর্তী প্রতিবেদনের দিকেই নজর রয়েছে।
সূত্র: প্রথম আলো,
সহায়ক সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড