পেনিসিলিনের আবিষ্কার চিকিৎসায় বিপ্লব আনলেও বাড়ছে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের উদ্বেগ
সংবাদ পোস্ট
-
প্রকাশ কাল:
সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
-
৫
জন দেখেছেন
চিকিৎসাবিজ্ঞানে পেনিসিলিনের আবিষ্কারকে অন্যতম যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রায় এক শতাব্দী আগে আবিষ্কৃত এই অ্যান্টিবায়োটিক অসংখ্য প্রাণ রক্ষা করেছে এবং ব্যাকটেরিয়াজনিত নানা সংক্রমণের চিকিৎসায় নতুন যুগের সূচনা করেছে। তবে সময়ের সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কারণে তৈরি হচ্ছে নতুন উদ্বেগ। অনেক ক্ষেত্রে রোগীর শরীরে প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক আর কার্যকর হচ্ছে না।
সম্প্রতি ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সত্তরোর্ধ্ব এক নারীর ঘটনা বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে। রক্ত ও প্রস্রাবে সংক্রমণ, জ্বর ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ওই নারী চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করেও পুরোপুরি সুস্থ হননি। পরে পরীক্ষা করে দেখা যায়, তাঁর শরীরে একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি হয়েছে। চিকিৎসককে ওষুধ পরিবর্তন করতে হয়েছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ বলা হয়। অর্থাৎ কোনো ব্যাকটেরিয়া নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে এমন প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে যে, ওই ওষুধ আর আগের মতো কাজ করে না। ফলে সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসাও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
পেনিসিলিনের আবিষ্কার…
পেনিসিলিন আবিষ্কারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্কটিশ বিজ্ঞানী ও চিকিৎসক স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিংয়ের নাম। ১৯২৮ সালে ব্যাকটেরিয়া নিয়ে গবেষণার সময় তিনি একটি পেট্রি ডিশে অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করেন।
গবেষণাগারে রেখে যাওয়া একটি পেট্রি ডিশে নীলচে-সবুজ ছত্রাক জন্মেছিল। ফ্লেমিং লক্ষ্য করেন, ছত্রাকটির আশপাশে থাকা ব্যাকটেরিয়া আর স্বাভাবিকভাবে বাড়ছে না। বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করে তিনি বুঝতে পারেন, ওই ছত্রাক থেকে এমন একটি পদার্থ তৈরি হচ্ছে, যা ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি থামিয়ে দিতে পারে। পরে তিনি ওই পদার্থের নাম দেন ‘পেনিসিলিন’।
১৯২৯ সালে পেনিসিলিন নিয়ে ফ্লেমিংয়ের গবেষণা প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে আরও গবেষণার মাধ্যমে এটি কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে চিকিৎসায় ব্যবহারের পথ তৈরি হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আহত ও সংক্রমিত মানুষের চিকিৎসায় পেনিসিলিনের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
পেনিসিলিনের আবিষ্কার ও চিকিৎসায় এর উন্নয়নে অবদানের জন্য ১৯৪৫ সালে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং, হাওয়ার্ড ফ্লোরি ও আর্নস্ট চেইন যৌথভাবে চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার পান।
শুধু পেনিসিলিন নয়, অ্যান্টিবায়োটিক নিয়েই উদ্বেগ…
অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। নিউমোনিয়া, রক্তের সংক্রমণ, ক্ষতস্থানের সংক্রমণসহ বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের চিকিৎসায় এসব ওষুধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অস্ত্রোপচার ও প্রসবের মতো চিকিৎসাপদ্ধতিকেও তুলনামূলক নিরাপদ করতে অ্যান্টিবায়োটিকের ভূমিকা রয়েছে।
তবে এসব ওষুধের অতিরিক্ত ও ভুল ব্যবহার বিপরীত পরিস্থিতি তৈরি করছে। সামান্য জ্বর, গলাব্যথা, কাশি বা অন্যান্য সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবন, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দিন বা কম দিন ওষুধ খাওয়া এবং অসম্পূর্ণ কোর্স শেষ করা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
এ সমস্যা শুধু মানুষের চিকিৎসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ চাষ এবং কৃষিতেও অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের বিষয়টি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক…
বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত। বিভিন্ন গবেষণায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক কেনা ও সেবন, প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা না করে ওষুধ ব্যবহার, অ্যান্টিবায়োটিকের পূর্ণ কোর্স শেষ না করা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা এবং পর্যাপ্ত রোগ নির্ণয় সুবিধার অভাব—এসব কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
হাসপাতাল, ওষুধশিল্পের কারখানা ও পরীক্ষাগারের অপরিশোধিত বর্জ্য পরিবেশে ছড়িয়ে পড়াও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। একইভাবে মানুষ ও প্রাণীর বর্জ্যের মাধ্যমে অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ মাটি ও পানিতে পৌঁছানোর আশঙ্কাও রয়েছে।
ফ্লেমিংয়ের সতর্কবার্তা…
অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের পথিকৃৎ আলেকজান্ডার ফ্লেমিং নিজেও ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল—অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে ওঠে ব্যাকটেরিয়া; মানুষ নয়। ফলে এমন প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটালে প্রচলিত ওষুধ কার্যকর নাও হতে পারে।
বর্তমান বিশ্বে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স সেই আশঙ্কাকেই বাস্তব সমস্যায় পরিণত করছে। নতুন নতুন ওষুধ আবিষ্কার হলেও অতিরিক্ত ও ভুল ব্যবহারের কারণে সেগুলোর কার্যকারিতাও একসময় কমে যেতে পারে।
কীভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব…
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ মোকাবিলায় রোগী, চিকিৎসক, ওষুধ বিক্রেতা, হাসপাতাল, সরকার এবং প্রাণিসম্পদ ও কৃষি খাত—সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক না খাওয়া, প্রেসক্রিপশনে দেওয়া মাত্রা ও সময় মেনে ওষুধ সেবন করা এবং নিজের ইচ্ছায় অ্যান্টিবায়োটিক শুরু বা বন্ধ না করা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ জোরদার, রোগ নির্ণয়ের সক্ষমতা বাড়ানো এবং মানুষ ও প্রাণীর ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি।
পেনিসিলিনের আবিষ্কার একসময় চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব এনেছিল। কিন্তু সেই অ্যান্টিবায়োটিকসহ জীবন রক্ষাকারী ওষুধগুলোর কার্যকারিতা ধরে রাখতে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সচেতন ও দায়িত্বশীল ব্যবহার।
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
এ বিভাগের আরো খবর