রাজধানীর ইসিবি চত্বর এলাকার নিউগিনি প্রপার্টিজে সশস্ত্র হামলা, গুলি, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। হামলার সময় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতেও ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে।
ঘটনাটি ঘটে শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচটি পিকআপে করে প্রায় দুই থেকে তিন শ মানুষ নিউগিনি প্রপার্টিজের মূল ফটকের সামনে জড়ো হন। পরে ফটক ভেঙে গুলি ছুড়তে ছুড়তে তাঁরা হাউজিং এলাকার ভেতরে প্রবেশ করেন।
প্রায় এক ঘণ্টা ধরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয় বলে জানা গেছে। হামলাকারীরা প্রথমে হাউজিংয়ের বিভিন্ন স্থাপনায় ঢুকে ভাঙচুর করে। পরে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতেও হামলা চালানো হয়। স্টুডিওর শাটার ও বিভিন্ন অংশ ভেঙে ভেতরে ঢুকে দামি সরঞ্জাম, আসবাব ও অন্যান্য জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
নির্মাণশ্রমিকদেরও মারধর…
হামলার সময় সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওর পাশের একটি নির্মাণাধীন ভবনে থাকা শ্রমিকরাও হামলাকারীদের হাতে হয়রানির শিকার হন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এক নির্মাণশ্রমিকের ভাষ্য অনুযায়ী, গুলির শব্দ শুনে তাঁরা ভবনের ছাদে উঠে ঘটনা দেখছিলেন। পরে হামলাকারীদের একটি দল ওই ভবনে গিয়ে তাঁদের ছাদ থেকে নিচে নামিয়ে আনে। এরপর কয়েকজনকে মারধর করে তাঁদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ নিয়ে নেওয়া হয়।
ওই শ্রমিকের দাবি, হামলাকারীদের হাতে দেশীয় অস্ত্র ছিল এবং কয়েকজনের হাতে পিস্তলও দেখা গেছে।
পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া….
হামলার একপর্যায়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে হামলাকারীদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাকারীদের সংখ্যা পুলিশের তুলনায় বেশি থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে কিছু সময়ের জন্য পিছু হটতে হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এ সময় পুলিশ পাঁচটি গুলি ছোড়ে।
ঘটনার পর ইসিবি চত্বরের নিউগিনি হাউজিং এলাকা পরিদর্শন করেন ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম। তিনি সাংবাদিকদের জানান, জমিজমা নিয়ে বিরোধ এবং জমির দখল-বেদখলকে কেন্দ্র করে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও প্রাথমিক তদন্তের বরাত দিয়ে জানিয়েছেন, সেখানে প্রায় ৩৫ কাঠা জমি নিয়ে দুই পক্ষের বিরোধ রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই ঘটনার মধ্যে সালমান মুক্তাদির নিজেও ঘটনার শিকার হয়েছেন।
হামলার পর সালমান মুক্তাদির তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। সেখানে তাঁর স্টুডিওর ভাঙচুরের চিত্র দেখা যায়। চেয়ার, টেবিল, টেলিভিশন, বাদ্যযন্ত্রসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ও আসবাব ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় দেখা গেছে।
সালমান মুক্তাদির জানান, তাঁর স্টুডিওতে ক্লায়েন্টদের বিভিন্ন ফুটেজ ও শুটিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ ছিল। হামলায় এসব জিনিস নষ্ট বা হারিয়ে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি তাঁর কাজও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে স্টুডিও ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কাজ বন্ধ না করার কথা জানিয়েছেন তিনি।
ঘটনার পর ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করা হয়েছে। নিউগিনি প্রপার্টিজের পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম ভুঁইয়া বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
মামলায় ১৩ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলায় নাম উল্লেখ করা ব্যক্তিরা হলেন—শাহরিয়া মাহমুদ, আবুল কাশেম, বাবুল হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী, মোহাম্মদ শাহিনুজ্জামান, মতিউর রহমান, মজিবুর রহমান, নুরুল ইসলাম, মিজানুর রহমান, এম কে আজাদ, মো. মামুন, মো. আসলাম ও মো. মুন্না।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, হামলাকারীরা শটগান, রিভলবার, চাপাতি ও রামদাসহ বিভিন্ন অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। এ সময় প্রায় ৫০টি গুলি ছোড়া হয় বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। হামলায় প্রকৌশলী ও নিরাপত্তাকর্মীসহ কয়েকজন আহত হন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ২৫ লাখ টাকা চুরি এবং বিপুল পরিমাণ সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ করা হয়েছে।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এখন পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মো. মামুন, আসলাম, মুন্না ও ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকার অনিক। আরেকজনের নাম তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তদন্ত চলছে।
নিউগিনি প্রপার্টিজের পরিচালক সাইফুল ইসলাম ভুঁইয়া দাবি করেছেন, হামলার সময় তাঁদের আবাসন প্রতিষ্ঠানের অফিস ও বেশ কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়। হামলাকারীরা সিসিটিভির ডিভিডিও খুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
তবে আশপাশের বিভিন্ন স্থাপনার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে হামলায় জড়িত ১৩ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
মামলায় নাম থাকা মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীর বক্তব্য এ বিষয়ে পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে করা অভিযোগের বিষয়ে তাঁর পক্ষের বক্তব্য প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
হামলার পর সালমান মুক্তাদির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগের কথা তোলেন। পরে এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, সালমান মুক্তাদিরের বক্তব্যে নির্দিষ্টভাবে কারও নাম বা চাঁদা দাবির ঘটনা উল্লেখ না থাকলে বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কেউ যদি নির্দিষ্ট অভিযোগ ও মামলা করেন, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা তদন্ত করবে।

কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও পরিদর্শন করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। আজ রোববার রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউ গিনি প্রপার্টিজেছবি
এর পর সালমান মুক্তাদির পৃথক ভিডিও বার্তায় হামলার ঘটনায় মামলা করতে দেরি হওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রয়োজন নেই; তিনি নিজে ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন। তবে দেশের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
ঘটনাটি নিয়ে পুলিশ তদন্ত করছে। জমি নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে হামলার পেছনে কারা জড়িত, হামলার উদ্দেশ্য কী ছিল এবং লুটপাট ও অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগের সত্যতা কতটুকু—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।