হলিউডে প্রতিষ্ঠিত হতে অনেক তারকাকেই দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তবে ব্রিটিশ-অস্ট্রেলীয় অভিনেত্রী নাওমি ওয়াটসের পথচলার গল্পটি ছিল আরও কঠিন। একসময় একের পর এক অডিশন দিয়েও কাজ পাচ্ছিলেন না তিনি। অর্থকষ্টে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে বাড়িভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় উচ্ছেদের আশঙ্কাতেও ছিলেন। অথচ সেই অভিনেত্রীই পরবর্তী সময়ে ‘মুলহল্যান্ড ড্রাইভ’, ‘দ্য রিং’, ‘২১ গ্রামস’, ‘কিং কং’ ও ‘দ্য ইমপসিবল’-এর মতো সিনেমায় অভিনয় করে আন্তর্জাতিক তারকাখ্যাতি অর্জন করেন।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর ৫৮তম জন্মদিন পালন করেছেন নাওমি ওয়াটস।
১৯৬৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের কেন্টের শোরহ্যামে জন্ম নাওমি ওয়াটসের। তাঁর বাবা পিটার ওয়াটস ছিলেন বিখ্যাত ব্যান্ড পিংক ফ্লয়েডের রোড ম্যানেজার ও সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার। নাওমির বয়স যখন মাত্র চার বছর, তখন তাঁর মা-বাবার বিচ্ছেদ হয়। এরপর সাত বছর বয়সেই বাবাকে হারান তিনি।
বাবার মৃত্যুর পর পরিবারকে নিয়ে জীবনের বিভিন্ন সময়ে নানা জায়গায় থাকতে হয়েছে তাঁকে। ১৪ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান নাওমি। ছোটবেলা থেকেই বারবার নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।
কিশোর বয়স থেকেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল নাওমির। তবে ক্যারিয়ারের শুরুতে মডেলিংয়ের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। জাপানে মডেল হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। পরবর্তী সময়ে অস্ট্রেলিয়ার একটি ম্যাগাজিনে ফ্যাশন এডিটর হিসেবেও কাজ করেন।
একসময় অভিনয়ের একটি কর্মশালায় অংশ নেওয়ার পর তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে যায়। চাকরি ছেড়ে অভিনয়ের জন্য অডিশন দেওয়া শুরু করেন। ১৯৮৬ সালে ‘ফর লাভ অ্যালোন’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তাঁর।
অস্ট্রেলিয়ায় কাজ করার সময় অভিনেত্রী নিকোল কিডম্যানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরবর্তীতে দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।
১৯৯০-এর দশকের শুরুতে হলিউডে পা রাখেন নাওমি ওয়াটস। কিন্তু প্রত্যাশামতো দ্রুত সাফল্য আসেনি। একের পর এক অডিশন দিয়েও নিয়মিত কাজ পাচ্ছিলেন না তিনি। ছোট-বড় কিছু সিনেমায় অভিনয় করলেও ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন আসছিল না।
দীর্ঘ সময় কাজ না পাওয়ার সেই কঠিন সময় সম্পর্কে নাওমি পরবর্তী সময়ে জানিয়েছেন, তাঁর আত্মবিশ্বাসও ভেঙে পড়েছিল। এমনকি বাড়িভাড়া বকেয়া থাকায় উচ্ছেদের আশঙ্কায় দিন কাটাতে হয়েছিল তাঁকে।
তাঁর এজেন্ট একসময় তাঁকে অতিরিক্ত ‘ইনটেন্স’ হিসেবে দেখতেন বলেও নাওমি জানিয়েছেন।
২০০১ সালে পরিচালক ডেভিড লিঞ্চের ‘মুলহল্যান্ড ড্রাইভ’ সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পান নাওমি ওয়াটস। এই সিনেমাটিই তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
সিনেমাটিতে অভিনয়ের মাধ্যমে ব্যাপক প্রশংসা পান তিনি। নাওমির নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘মুলহল্যান্ড ড্রাইভ’-এর আগে ও পরের ক্যারিয়ারকে যেন দুই ভাগে দেখা যায়।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে।
২০০২ সালে ‘দ্য রিং’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে মূলধারার দর্শকদের কাছে আরও পরিচিত হয়ে ওঠেন নাওমি। হরর ঘরানার এই সিনেমাটি বড় ব্যবসায়িক সাফল্য পায়।
এরপর ‘২১ গ্রামস’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য ২০০৪ সালে একাডেমি অ্যাওয়ার্ডে সেরা অভিনেত্রী বিভাগে মনোনয়ন পান তিনি। একই চরিত্রের জন্য গোল্ডেন গ্লোব ও বাফটা পুরস্কারের মনোনয়নও পেয়েছিলেন।
২০১৩ সালে ‘দ্য ইমপসিবল’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য দ্বিতীয়বার অস্কার মনোনয়ন পান নাওমি ওয়াটস।
নাওমি ওয়াটসের প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ প্রকাশ্যে নিশ্চিত নয়। তবে সেলিব্রিটি নেট ওয়ার্থের হিসাব অনুযায়ী, তাঁর আনুমানিক সম্পদের পরিমাণ ৩ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৪৩০ কোটি টাকা।
এ ছাড়া ‘কিং কং’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য তাঁর পারিশ্রমিক ৫০ লাখ মার্কিন ডলার ছিল বলে আইএমডিবিতে তথ্য রয়েছে।
একসময় যে অভিনেত্রী বাড়িভাড়া দিতে না পেরে উচ্ছেদের আশঙ্কায় ছিলেন, দীর্ঘ সংগ্রাম পেরিয়ে তিনিই আজ হলিউডের পরিচিত ও সফল অভিনেত্রীদের একজন। নাওমি ওয়াটসের ক্যারিয়ার তাই শুধু তারকাখ্যাতির গল্প নয়, বরং দীর্ঘ অপেক্ষা, ব্যর্থতা এবং ঘুরে দাঁড়ানোরও গল্প।