নিজস্ব প্রতিবেদক | সংবাদ পোস্ট
খুলনা, ১৫ অক্টোবর ২০২৬: সুন্দরবনের নদী ও খালে বিষ প্রয়োগ করে অবৈধভাবে মাছ ধরা বন্ধ এবং জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিশেষ ‘বিষ শনাক্তকরণ ল্যাবরেটরি’ স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের কাজ আগামী বছর শুরু হতে পারে বলে আশা করছে বন বিভাগ। ল্যাবরেটরিটি স্থাপন করা হলে মাছ ও সংশ্লিষ্ট নমুনায় বিষাক্ত রাসায়নিকের উপস্থিতি বৈজ্ঞানিকভাবে শনাক্ত করা এবং এ ধরনের অপরাধের প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ১৪ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ ধরার ঘটনায় অভিযান ও গ্রেপ্তার হলেও দ্রুত রাসায়নিক পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বাসসকে জানান, বিষাক্ত রাসায়নিক পরীক্ষা ও শনাক্তকরণের জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তাব প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রস্তাবটি শিগগিরই পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের জন্য তা উপস্থাপন করা হবে।
কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আগামী বছর প্রকল্পটির কাজ শুরু হতে পারে। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত প্রকল্পটি প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে; ল্যাবরেটরি স্থাপনের চূড়ান্ত অনুমোদন বা কার্যক্রম শুরুর নির্দিষ্ট তারিখ নিশ্চিত হয়নি।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাসানুর রহমান জানান, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় পরীক্ষার কিটও রাখার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে প্রয়োজনীয় নমুনা দ্রুত পরীক্ষা করা যায়।
বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সুন্দরবনের নদী ও খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার অভিযোগে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানের সময় বিষের বোতল, মাছ, নৌকা ও জাল জব্দ করা হলেও দ্রুত রাসায়নিক পরীক্ষার সুযোগ না থাকায় জব্দ করা মাছ বিষাক্ত কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা কঠিন।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, উপযুক্ত পরীক্ষার কিট ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ছাড়া উদ্ধার করা মাছ বিষাক্ত নাকি খাওয়ার জন্য নিরাপদ, তা দ্রুত নির্ধারণ করা সম্ভব হয় না। নমুনা পরীক্ষা ও প্রমাণ সংগ্রহে বিলম্ব হলে আদালতে অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করতেও সমস্যা তৈরি হয়।
বন বিভাগের মতে, প্রস্তাবিত ল্যাবরেটরি চালু হলে নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়বে। এতে বিষ প্রয়োগে মাছ ধরার ঘটনায় বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সংগ্রহ এবং তদন্তের কার্যকারিতা বাড়তে পারে।
বন বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার অভিযোগে ৭৩টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় মোট ৭৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। তাঁদের মধ্যে ৬২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
একই সময়ে পরিচালিত অভিযানে ৮৭ বোতল ও দুই লিটার বিষ, ২৪৩ দশমিক ৫ কেজি চিংড়ি, ২১০ কেজি সাদা মাছ এবং ৭৩৬ কেজি কাঁকড়া জব্দ করা হয়। এ ছাড়া ১৪৪টি নৌকা ও ১২৫টি অবৈধ জাল জব্দের তথ্য দিয়েছে বন বিভাগ।
এই পরিসংখ্যান সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যক্রমের চিত্র তুলে ধরে। তবে এসব মামলা বা গ্রেপ্তারের সংখ্যা দিয়ে পুরো সুন্দরবনে এ ধরনের অপরাধের মোট ব্যাপ্তি নির্ধারণ করা যায় না।
পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, নদী ও খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরলে শুধু লক্ষ্যবস্তু মাছই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; পানিতে থাকা অন্যান্য জলজ প্রাণী এবং তাদের আবাসস্থলও ঝুঁকির মুখে পড়ে। জোয়ার-ভাটার মাধ্যমে দূষিত পানি ছড়িয়ে পড়লে ক্ষতিকর রাসায়নিক আরও বিস্তৃত এলাকায় পৌঁছাতে পারে। এতে জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক প্রজনন ও খাদ্যশৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বাসসকে বলেন, বিষ শনাক্তকরণের জন্য দেশের বিদ্যমান বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতাও কাজে লাগানো যেতে পারে। তাঁর মতে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনকে পরীক্ষার কাজে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সময়ে বিদেশ থেকে পরীক্ষার কিট আমদানির বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সুজাত আহমেদ বাসসকে বলেন, বিষাক্ত বা রাসায়নিক দূষিত মাছ নিয়মিত খেলে মানবদেহে ক্ষতিকর পদার্থ জমার ঝুঁকি থাকতে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি বিষক্রিয়া বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট মাছ বিষাক্ত কি না, তা কেবল গন্ধ, রং বা বাহ্যিক চেহারা দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না। এ জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা।
সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিষ শনাক্তকরণ ল্যাবরেটরি স্থাপনের পরিকল্পনাকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে প্রকল্পের অনুমোদন, অর্থায়ন, পরীক্ষার প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা এবং নমুনা পরীক্ষার ফল তদন্তে যথাযথভাবে ব্যবহারের ওপর।
প্রকল্পটি এখনো প্রস্তাবের পর্যায়ে থাকায় ল্যাবরেটরি কবে চালু হবে, কী ধরনের রাসায়নিক শনাক্ত করা যাবে এবং পরীক্ষার ফল পেতে কত সময় লাগবে—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। অনুমোদন ও বাস্তবায়নের অগ্রগতি স্পষ্ট হলে সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগে মাছ ধরা প্রতিরোধে উদ্যোগটির সম্ভাব্য প্রভাব আরও ভালোভাবে মূল্যায়ন করা যাবে।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস),সুন্দরবন পূর্ব ও পশ্চিম বন বিভাগের কর্মকর্তাদের বক্তব্য; খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরীর বক্তব্য।
সংবাদ পোস্ট | সংবাদে সত্য, তথ্যে নির্ভরতা