জাতীয় / প্রশাসন / সরকারি চাকরি
ঢাকা: সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরে ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডের প্রায় এক লাখ অস্থায়ী পদে নিয়োগের প্রস্তাব আটকে রয়েছে। আউটসোর্সিং নীতিমালা সংশোধনের পর সরাসরি ব্যক্তির কাছ থেকে সেবা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হলেও সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালায় এ বিষয়ে স্পষ্ট বিধান না থাকায় নিয়োগপ্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা দিয়েছে। ফলে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন দপ্তরে নতুন সেবাকর্মী নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না।
প্রথম আলোর ২১ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশোধিত নীতিমালার কারণে বেসরকারি সেবা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আগের পদ্ধতিতে নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না। আবার সরাসরি ব্যক্তিকে নিয়োগ বা তাঁর কাছ থেকে সেবা নেওয়ার ক্ষেত্রেও আইনি অস্পষ্টতা রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় গত ২১ সেপ্টেম্বর ‘আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় সেবা গ্রহণ নীতিমালা, ২০২৫’ সংশোধন করে। নতুন নীতিমালায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেবা নেওয়ার পরিবর্তে সরাসরি ব্যক্তির কাছ থেকে সেবা গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়। পাশাপাশি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরগুলোকে সরাসরি লোক নিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগ অনুমোদিত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি (আইআইএফসি)-এর মাধ্যমেও সেবা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে সংশোধিত নীতিমালায় সুযোগ রাখা হলেও সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালায় সরাসরি ব্যক্তির কাছ থেকে এ ধরনের সেবা কেনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় বিধান না থাকায় বাস্তবায়নে বাধা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডে অস্থায়ী কর্মী নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী, ল্যাব সহকারী, ট্রলিম্যানসহ বিভিন্ন ধরনের সেবাকর্মী নিয়োগের প্রস্তাব আটকে আছে। সরকারি দপ্তর ও বাসভবনের পরিচ্ছন্নতা এবং অন্যান্য সহায়ক কাজের জন্যও কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২০ হাজার সেবাকর্মী নিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীন সরকারি বাসভবন ও দপ্তরের কাজে প্রায় পাঁচ হাজার কর্মী নিয়োগের কথা রয়েছে। রেলপথ, সমাজকল্যাণ ও কৃষি মন্ত্রণালয়সহ আরও কয়েকটি মন্ত্রণালয়েও একই ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডের প্রায় এক লাখ অস্থায়ী পদে নিয়োগের প্রস্তাব ঝুলে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংশোধিত নীতিমালা বাস্তবায়নের জটিলতা কাটাতে অর্থ বিভাগ সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধন আনার জন্য বাংলাদেশ সরকারি ক্রয় কর্তৃপক্ষের (বিপিপিএ) কাছে চিঠি পাঠিয়েছে।
অর্থ বিভাগের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি কাজে গতি আনা, দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো, ব্যয় সাশ্রয় এবং মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই নীতিমালা সংশোধন করা হয়েছে। কিন্তু সংশোধিত নীতিমালা কার্যকর করতে সরাসরি ব্যক্তির কাছ থেকে সেবা কেনার বিষয়টি সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
অর্থ বিভাগের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বিপিপিএ বিষয়টি পর্যালোচনা করে গত ১৪ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, আউটসোর্সিং ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সেবাকর্মীদের সরাসরি চুক্তিগত সম্পর্ক এড়িয়ে চলা। পাশাপাশি এসব কর্মীকে ভবিষ্যতে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি থেকে সম্ভাব্য আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতা এড়ানোও ছিল এ ব্যবস্থার লক্ষ্য।
বর্তমান ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সেবা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারি কর্তৃপক্ষ চুক্তি করে। ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা সরকারি দপ্তরে সেবা দেন। কিন্তু সরাসরি ব্যক্তির সঙ্গে চুক্তি করা হলে আউটসোর্সিং ব্যবস্থার কাঠামো পরিবর্তিত হতে পারে বলে মনে করছে বিপিপিএ।
এ ছাড়া সরাসরি ব্যক্তির সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে চুক্তি বাস্তবায়ন, দায়বদ্ধতা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। বেসরকারি সেবা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ বন্ধ হলে সংশ্লিষ্ট সেবা খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা জানিয়েছে সংস্থাটি।
এ পরিস্থিতিতে অর্থ বিভাগ, বিপিপিএ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বয়ে আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগ নিয়ে সেবাকর্মী ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের অভিযোগ, নিয়োগের আগে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে অর্থ দিতে হয় এবং চাকরির পর বেতন থেকেও একটি অংশ কেটে রাখা হয়। তাঁদের দাবি, সরকারি দপ্তরে সরাসরি নিয়োগের ব্যবস্থা করা হোক।
অন্যদিকে সেবা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বলছেন, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এসব প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা রয়েছে। সরাসরি সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে বিপুলসংখ্যক কর্মী ব্যবস্থাপনা ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার সক্ষমতা নিয়েও তাঁরা প্রশ্ন তুলেছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালে প্রথম আউটসোর্সিং নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। সরকারি কর্মীদের বেতন-ভাতা ও পেনশনের ব্যয় কমানোর লক্ষ্য সামনে রেখে ২০০৯ সাল থেকে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির বিভিন্ন অস্থায়ী পদে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মী নেওয়া শুরু হয়।
পরবর্তী সময়ে ২০১৮ ও ২০২৫ সালে নীতিমালাটি সংশোধন করা হয়। সর্বশেষ সংশোধনের পর সরাসরি ব্যক্তির কাছ থেকে সেবা গ্রহণের সুযোগ এবং সরকারি ক্রয়বিধির সঙ্গে তার সামঞ্জস্য নিয়ে নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে।
প্রায় এক লাখ অস্থায়ী পদে নিয়োগের প্রস্তাব আটকে থাকায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর জনবল চাহিদা পূরণে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে এসব পদে নিয়োগের নির্দিষ্ট সময়সূচি বা জটিলতা নিরসনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে প্রতিবেদনে নিশ্চিত কোনো ঘোষণা নেই।
সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালার প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং নিয়োগপদ্ধতি স্পষ্ট করার ওপরই এ পরিস্থিতির সমাধান নির্ভর করছে।
সূত্র: প্রথম আলো