গুম ও মানবাধিকার সংক্রান্ত বিদ্যমান অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’ এবং ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়া প্রস্তুত করেছে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
রবিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে খসড়া দুটি নিয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। সভায় আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী, বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
সভায় উপস্থিত অংশীজনরা গুম তদন্তে পুলিশের এসআই পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাদের মতে, উচ্চপর্যায়ের কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে নিচু পদমর্যাদার কর্মকর্তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এছাড়া অভিযুক্ত বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্তে একই বাহিনীর সম্পৃক্ততা নিয়েও আপত্তি তোলা হয়। কেউ কেউ আইন দুটি নিয়ে গণশুনানির আয়োজনের দাবি জানান। মানবাধিকার কমিশনের বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা কমিশনের হাতেই রাখার প্রস্তাবও উঠে আসে আলোচনায়।
সভায় জানানো হয়, আগের গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ছিল। নতুন খসড়ায় গুমকে সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে গুমের অভিযোগ শুধু মানবাধিকার কমিশনের তদন্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ফৌজদারি আইনের আওতায় বিচার ও তদন্ত করা যাবে।
নতুন আইনে শাস্তির বিধান আরও কঠোর করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। আগে যেখানে কম সাজা দেওয়ার সুযোগ ছিল, সেখানে এখন ন্যূনতম ১০ বছরের কারাদণ্ড নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
খসড়ায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, থানায় মামলা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানো হলে ভুক্তভোগীরা সরাসরি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগ করতে পারবেন। তদন্ত ৯০ দিনের মধ্যে শেষ করার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার শেষ না হলে সুপ্রিম কোর্টে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে হবে বলেও খসড়ায় উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অজুহাতে কাউকে গুম করা যাবে না বলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে নতুন প্রস্তাবিত আইনে।
সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে এম ইলিয়াস আলীর সহধর্মিণী ও সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদী বলেন, শুধু ভবিষ্যতে গুম বন্ধ করাই নয়, অতীতে যেসব গুমের ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর বিচারও নিশ্চিত করতে হবে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১২ সালে তার স্বামী এম ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পরিবার এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখেনি।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সরকার আর কোনো গুমের ঘটনা দেখতে চায় না। একইসঙ্গে কার্যকর ক্ষমতাসম্পন্ন মানবাধিকার কমিশন গড়ে তোলার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, নতুন আইনে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হিসেবে বিবেচনার সুযোগ রাখা হচ্ছে, যাতে কমিশন আরও শক্তিশালী ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাজেট অধিবেশনের পর আইন দুটি সংসদে উত্থাপন করা হতে পারে বলেও জানান তিনি।