১৯৮১ সালের ১৭ মে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম একটি বাঁক বদলের দিন। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নির্মমভাবে হত্যা করার পর, বাংলাদেশ এক অন্ধকার ও স্বৈরশাসনের যুগে নিমজ্জিত হয়েছিল। সেই অবরুদ্ধ ও কণ্টককীর্ণ সময়ে বাঙালির আশার আলো হয়ে, নির্বাসিত জীবন শেষে প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা। তাঁর এই ফিরে আসাকে কেবল একজন ব্যক্তির দেশে ফেরা হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি ছিল মূলত বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম এবং বাঙালির অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের এক নতুন সূচনা।
১৯৭৫ সালের আগস্টের সেই কালরাতে শেখ হাসিনা এবং তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা জার্মানিতে অবস্থান করার কারণে অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই তাঁরা পরিণত হন নিঃস্ব ও আশ্রয়হীন নাগরিকে। পরবর্তীতে ভারতের তৎকালীন সরকারের রাজনৈতিক আশ্রয়ে দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর তাঁদের প্রবাসে কাটাতে হয়। স্বজন হারানোর তীব্র বেদনা এবং দেশের মাটিতে ফেরার নিষেধাজ্ঞা—সব মিলিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল তাঁদের জীবন।
অন্যদিকে, দেশের ভেতরে তখন সামরিক জান্তার শাসন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধূলিসাৎ করার অপচেষ্টা এবং আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বহীন করে ধ্বংস করার গভীর ষড়যন্ত্র চলছিল। দল যখন চরম সংকটে এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত, ঠিক তখনই ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে প্রবাসে থাকা অবস্থায় শেখ হাসিনাকে সর্বসম্মতিক্রমে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। এই সিদ্ধান্ত ছিল তৎকালীন বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এক যুগান্তকারী ঘটনা।
১৯৮১ সালের ১৭ মে, একটি কালবৈশাখী ঝড়ের বিকেলে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি বোয়িং বিমানে চড়ে ঢাকা কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে অবতরণ করেন শেখ হাসিনা। সেদিন ঢাকার প্রকৃতিতে ছিল তীব্র ঝড়-বৃষ্টি, কিন্তু সেই ঝড় ও প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে লাখ লাখ মুক্তিকামী মানুষ তাঁদের প্রিয় নেত্রীকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দর থেকে শুরু করে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ পর্যন্ত সমবেত হয়েছিলেন। রাজধানী ঢাকা পরিণত হয়েছিল এক জনসমুদ্রে।
সেদিন লাখো জনতার উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে শেখ হাসিনা আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেছিলেন, “সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে বাংলার মানুষের মুক্তির সংগ্রামে আমি নিজেকে উৎসর্গ করতে চাই।” তাঁর এই ঘোষণা তৎকালীন স্বৈরশাসকদের ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল এবং সাধারণ মানুষের মনে দীর্ঘ ছয় বছর পর এক নতুন আশার সঞ্চার করেছিল।
স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর শেখ হাসিনাকে এক বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। একদিকে স্বৈরাচারী সরকারের দমন-পীড়ন, অন্যদিকে নিজের জীবনের ওপর বারবার নেমে আসা ঘাতকের হামলা। কিন্তু কোনো বাধাই তাঁকে তাঁর লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। তিনি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া চষে বেড়িয়েছেন, দলকে সুসংগঠিত করেছেন এবং দীর্ঘ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন।
তাঁর দীর্ঘ আন্দোলনের ফলেই ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারের পতন ঘটে এবং দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তন হয়। শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণেই বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় পর ১৯৯৬ সালে এবং পরবর্তীতে ২০০৯ থেকে টানা মেয়াদে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার ফিরে পায়। তাঁর হাত ধরেই বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার এবং ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হয়, যা বাঙালি জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করে।
আজকের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ—যা অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়নশীল, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষম এবং বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো এক রাষ্ট্র—তার বীজ রোপিত হয়েছিল ১৯৮১ সালের ১৭ মে। শেখ হাসিনা যদি সেদিন সমস্ত ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে দেশে ফিরে না আসতেন, তবে বাংলাদেশের ইতিহাস আজ অন্যরকম হতে পারতো।
১৭ মে তাই কেবল একটি দিবস নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয় ফিরে পাওয়ার দিন। স্বৈরাচারের অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রার দিন। শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আমাদের এই বার্তাই দেয় যে, নেতৃত্ব যদি দেশপ্রেম ও সাহসিকতায় ভরা হয়, তবে যেকোনো অন্ধকার ভেদ করে একটি জাতি আবার আলোর মুখ দেখতে পারে।