উপশিরোনাম: উখিয়ায় গভীর নলকূপ খননের সময় গ্যাস নির্গত হয়ে আগুনের সূত্রপাত; ঝুঁকি এড়াতে ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ, ঘটনাস্থলে বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল
নিজস্ব প্রতিবেদক | সংবাদ পোস্ট
কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পর্যটন এলাকা ইনানীতে গভীর নলকূপ স্থাপনের সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসে সৃষ্ট আগুন ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে জ্বলছিল। অবিরাম গ্যাস নির্গত হওয়ায় ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট চেষ্টা চালিয়েও আগুন নেভাতে পারেনি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং গ্যাসের উৎস ও বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে ঘটনাস্থলে কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) বিশেষজ্ঞ দল।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকালে উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানী গ্রামের ছোট ইনানী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য মাটি খননের একপর্যায়ে ভূগর্ভ থেকে উচ্চ চাপে গ্যাস বের হতে শুরু করে। পরে কোনো একটি উৎস থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। এরপর থেকে সেখানে আগুন জ্বলতে থাকে।
ঘটনাটি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। আগুনের শিখা কাছাকাছি থাকা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বৈদ্যুতিক লাইনে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
গ্যাসের উৎস অনুসন্ধানে বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দল
ঘটনার কারণ অনুসন্ধান এবং ভূগর্ভ থেকে নির্গত গ্যাসের প্রকৃতি জানতে বাপেক্সের একটি বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে খননকাজের সময় গ্যাসযুক্ত কোনো ভূস্তরের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় গ্যাস বের হতে পারে।
বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান ও ব্যবস্থাপক এস এম নাফিফুন আরহামের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূগর্ভের ফাটল বা ভূতাত্ত্বিক দুর্বল অংশ দিয়ে গ্যাস উপরের দিকে উঠে আসতে পারে। গ্যাসের চাপ বেশি থাকলে এভাবে কয়েক দিন পর্যন্ত গ্যাস নির্গত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
আগুনের শিখার রং ও ধোঁয়া দেখে গ্যাসে তুলনামূলক ভারী হাইড্রোকার্বন থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণ ছাড়া গ্যাসের প্রকৃত উপাদান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
একইভাবে, ঘটনাস্থলের নিচে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ভূতাত্ত্বিক তথ্য বিশ্লেষণ ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা প্রয়োজন।
কেন নেভানো যাচ্ছে না আগুন?
ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। আগুন নেভাতে পানি ও বালুসহ বিভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করা হলেও ভূগর্ভ থেকে অবিরাম গ্যাস বের হতে থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, গ্যাসের নির্গমনপথ জোর করে বন্ধ করার চেষ্টা করলে ভূগর্ভের অন্য কোনো দুর্বল অংশ দিয়ে গ্যাস বের হতে পারে। এতে নতুন জায়গায় আগুন লাগা কিংবা ঝুঁকি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ কারণে গ্যাসের প্রবাহ ও চাপের পরিস্থিতি বিবেচনা করে সতর্কতার সঙ্গে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আপাতত আগুনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানুষের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ এবং আশপাশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
২০০ মিটার এলাকাজুড়ে নিরাপত্তাবেষ্টনী
সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে স্থানীয় প্রশাসন ঘটনাস্থলের চারপাশে প্রায় ২০০ মিটার এলাকাজুড়ে নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। ওই এলাকার মধ্যে সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত করার পাশাপাশি সবাইকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বাপেক্সের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এদিকে, আগুনের শিখা বৈদ্যুতিক লাইনের কাছে পৌঁছে গেলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। বিকল্প ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় চালুর বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইনানীতে কি প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত রয়েছে?
ভূগর্ভ থেকে গ্যাস বেরিয়ে আগুন জ্বলার ঘটনায় ইনানী এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত থাকার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে শুধু গ্যাস বের হওয়া বা আগুন জ্বলার ঘটনা থেকে সেখানে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত রয়েছে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূগর্ভের তুলনামূলক অগভীর স্তরেও বিভিন্ন ধরনের গ্যাস জমা থাকতে পারে। কিন্তু এসব গ্যাসের উৎস, রাসায়নিক গঠন, চাপ, পরিমাণ এবং উত্তোলনযোগ্যতা নির্ধারণের জন্য বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা প্রয়োজন।
বাপেক্সের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার ফলাফল এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পরীক্ষার ফল পাওয়ার পরই গ্যাসের প্রকৃতি সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
পর্যটন এলাকায় বাড়ছে উদ্বেগ
কক্সবাজারের অন্যতম পরিচিত পর্যটন এলাকা ইনানীতে এ ধরনের ঘটনা স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটনসংশ্লিষ্ট কর্মী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে আগুন জ্বলতে থাকায় আশপাশের এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আগুনের বিস্তার রোধ করা, গ্যাসের নির্গমন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা এবং সাধারণ মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে রাখা।
ঘটনার প্রকৃত কারণ, গ্যাসের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এবং ভূগর্ভে এর মজুতের পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পেতে বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষা করতে হবে। পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগে ইনানীতে বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে—এমন দাবি করা সমীচীন হবে না।
ক্যাটাগরি: সারাদেশ | কক্সবাজার | পরিবেশ ও জ্বালানি
সংবাদসূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।