আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সংবাদ পোস্ট
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশে প্রস্তাবিত ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সিয়াং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বেড়েছে। প্রকল্পটির বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন সংগঠনের আন্দোলনের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকাটিতে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। সিয়াং উপত্যকা ও আপার সিয়াং অঞ্চলে ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর (সিএপিএফ) ৩৪টি কোম্পানি মোতায়েন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে অতিরিক্ত নিরাপত্তা সদস্য আনা হয়েছে। ভারতীয় বিমানবাহিনীর পরিবহন বিমানের একাধিক ফ্লাইটে নভি মুম্বাই থেকে অরুণাচল প্রদেশের পাসিঘাট বিমানবন্দরে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে আসা হয়েছে। এর মধ্যে র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (র্যাফ) সদস্যরাও রয়েছেন।
অরুণাচল প্রদেশ পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে এনডিটিভি জানিয়েছে, সিয়াং ও আপার সিয়াং অঞ্চলে আগে থেকেই র্যাফের কয়েকটি দল দায়িত্ব পালন করছে। নতুন করে নিরাপত্তা জোরদার করতে আসাম রাজ্যের ডিব্রুগড়, শিবসাগর, জোরহাট, নাগাঁও ও নলবাড়ি এলাকা থেকে সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের (সিআরপিএফ) সদস্যদের সিয়াং উপত্যকায় পাঠানো হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মোট ৩৪টি সিএপিএফ কোম্পানি সেখানে মোতায়েন রয়েছে। এর মধ্যে নারী র্যাফ সদস্যরাও রয়েছেন।
প্রস্তাবিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে আন্দোলন আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কার মধ্যে এই নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৩ অক্টোবর অরুণাচল প্রদেশের ইস্ট সিয়াং জেলার পাসিঘাটে প্রস্তাবিত সিয়াং বাঁধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়। ওই সময় ন্যাশনাল হাইড্রোইলেকট্রিক পাওয়ার করপোরেশনের (এনএইচপিসি) স্থানীয় কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়। কয়েকটি স্থানে অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি পুলিশের গাড়িতেও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে স্থানীয় বিধায়কদের বাড়িঘরে ভাঙচুর চালানোর অভিযোগও রয়েছে।
এসব ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়। পাসিঘাট, মেবো ও রুকসিন এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারার অধীনে বিধিনিষেধও বহাল রাখা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
এ ছাড়া, পাসিঘাটে বিক্ষোভ-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় একাধিক মামলা করেছে অরুণাচল প্রদেশ পুলিশ। এনডিটিভির প্রতিবেদনে পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, এসব ঘটনায় ২১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আরও আটজনকে আটক করা হয়েছে।
সিয়াং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ভারতের অন্যতম বৃহৎ প্রস্তাবিত জলবিদ্যুৎ উদ্যোগ। প্রকল্পটির সম্ভাব্য উৎপাদনক্ষমতা ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনাকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধিতা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগের অন্যতম বিষয় হলো, বড় বাঁধ নির্মাণের ফলে তাঁদের বসতভিটা, কৃষিজমি, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রার ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। সম্ভাব্য ভূমি হারানো, বাস্তুচ্যুতি এবং নদী ও প্রতিবেশব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
অন্যদিকে, ভারতের কৌশলগত ও জ্বালানি পরিকল্পনার সঙ্গে প্রকল্পটির সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তের ওপারে চীনের বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে ভারতের উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে সিয়াং প্রকল্পকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই ও বাস্তবায়ন নিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উদ্বেগ এবং সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যে বিরোধ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনায় অরুণাচল প্রদেশের সিয়াং উপত্যকায় পরিস্থিতি এখন সংবেদনশীল। অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের মধ্য দিয়ে কর্তৃপক্ষ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে।
তবে প্রকল্পবিরোধী আন্দোলনের পেছনে থাকা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উদ্বেগ, ভূমি ও পরিবেশ রক্ষার দাবি এবং প্রকল্পটির কৌশলগত গুরুত্ব—সব মিলিয়ে বিষয়টি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্বেগ ও দাবিগুলো কীভাবে মোকাবিলা করা হয়, তার ওপরও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি অনেকাংশে নির্ভর করবে।
বিভাগ: আন্তর্জাতিক
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি (NDTV)