বিদেশে ভালো বেতনের চাকরির আশায় রাশিয়ায় গিয়ে ভয়াবহ পরিণতির শিকার হয়েছেন ৩০ বাংলাদেশি। নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে কাজ দেওয়ার কথা বলে তাঁদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা নেওয়া হলেও রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁদের পাঠানো হয় দেশটির সেনাবাহিনীর কাছে। মাত্র ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের নামানো হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে। সেখানে ড্রোন হামলায় ৩০ জনের মধ্যে অন্তত ২০ জনের মৃত্যুর বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়ার কথা জানিয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।
এসআরবির প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের একধরনের ‘শিকার’ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। তাঁদের অবস্থানে প্রতিপক্ষের ড্রোন হামলা হলে সেই হামলার সূত্র ধরে শত্রুপক্ষের অবস্থান ও দূরত্ব শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হতো বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহা. আসাদুজ্জামান।
তিনি জানান, বাংলাদেশ থেকে যাঁদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তাঁদের অধিকাংশেরই যুদ্ধ করার মতো শারীরিক প্রস্তুতি, সামরিক প্রশিক্ষণ কিংবা প্রয়োজনীয় কৌশলগত দক্ষতা ছিল না। এরপরও মাত্র ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়।
এসআরবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে তিনটি ভাগে বাংলাদেশিদের মোতায়েন করা হয়েছিল। সেখানে প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় ১৭ জন নিহত হন। পরবর্তী সময়ে আরও তিনজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে ৩০ জনের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যুর বিষয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে সংস্থাটি।
জীবিতদের মধ্যে দুজন আহত অবস্থায় বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন। তাঁদের একজন রাজন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় তাঁর কোমর ভেঙে যায় এবং শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়ে পড়ে। এরপর বুকের ওপর ভর দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে তিনি একটি ক্যাম্পে পৌঁছাতে সক্ষম হন।
অন্যদিকে, বাকি আটজনের মধ্যে দুজন মস্কোর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আরও ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ওই ৩০ বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে।
কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁদের পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। পরে প্রতিশ্রুত কর্মস্থলে পাঠানোর পরিবর্তে তাঁদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয় তাঁদের।
এ ঘটনায় মানব পাচার চক্রের অন্যতম হোতা হিসেবে জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান (৫৫) এবং আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে এসআরবি।
সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশি চক্রের পাশাপাশি রাশিয়ার ইগর নামের এক ব্যক্তি এবং কিরগিজস্তানের জুলিয়া নামের এক নারীও এ ঘটনায় যুক্ত ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও অভিযান চলছে। চক্রের আরেক সদস্য মোস্তাফিজুরকে গ্রেপ্তারের চেষ্টাও চলছে।
এসআরবির প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন জেলার তরুণেরা এভাবে রাশিয়ায় গেছেন। তাঁদের মধ্যে গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও গাজীপুরের বাসিন্দারাও রয়েছেন।
এসআরবির কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। তাঁদের কেউ কেউ ঋণ করে বিদেশে যাওয়ার খরচ জোগাড় করেছিলেন। এখন অনেক পরিবার স্বজনের মৃত্যুর খবর পেলেও তাঁদের মরদেহ দেখতে বা দেশে ফিরিয়ে আনতে পারছেন না।
বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় প্রতারক চক্রের হাতে অর্থ তুলে দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই করার আহ্বান জানিয়েছেন এসআরবির কর্মকর্তারা। তাঁদের মতে, চাকরির প্রতিশ্রুতি, বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়া এবং অর্থ লেনদেনের বিষয়ে যথাযথ যাচাই না করলে চাকরিপ্রত্যাশীরা মানব পাচারের মতো ভয়াবহ অপরাধের শিকার হতে পারেন।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে বাংলাদেশিদের মৃত্যুর এ ঘটনা বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে প্রতারণা ও মানব পাচারের ঝুঁকি আবারও সামনে এনেছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং ভুক্তভোগীদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহে তদন্ত ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সূত্র: প্রথম আলো; এসআরবির সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া তথ্য।
সংবাদ পোস্ট | নির্ভরযোগ্য সংবাদ, দায়িত্বশীল উপস্থাপন।