জাতীয় / সারাদেশ / পর্যটন
নিজস্ব প্রতিবেদক | সংবাদ পোস্ট
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে চলমান অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ প্রত্যাহার নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। অবরোধকারীদের পাঁচ দফা দাবির চারটি নিয়ে সমঝোতা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সরকারি প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। তবে সাজেক থেকে সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি না পাওয়ায় অবরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) সাজেকের উজো বাজারে সরকারি প্রতিনিধি দল ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে প্রায় আড়াই ঘণ্টা বৈঠক হয়। পরে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যে আলোচনায় অগ্রগতির কথা উঠে এলেও অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, অবরোধের কারণে সাজেকের পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এতে পর্যটননির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ওয়াদুদ ভূঁইয়া জানিয়েছেন, আন্দোলনকারীদের পাঁচ দফা দাবির চারটি নিয়ে সমঝোতা হয়েছে। বাকি একটি বিষয়ে আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে আলোচনা করে সমাধানে পৌঁছানোর আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সোমবার সন্ধ্যায় খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি জানান, আলোচনা আরও এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা হলে শিগগিরই পর্যটন সড়ক খুলে দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তাঁরা।
তবে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাঁদের প্রধান দাবি নিয়ে সরকার নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতে পারেনি। এ কারণে তাঁরা অবরোধ প্রত্যাহারে সম্মত হননি।
আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো, সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া।
সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব বিজয় কান্তি চাকমার বক্তব্য অনুযায়ী, বৈঠকে সরকারি প্রতিনিধি দল এ বিষয়ে নির্দিষ্ট নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। এ কারণে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের দাবি, সরকার পক্ষ এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে তিন সপ্তাহ সময় চেয়েছিল। তবে তাঁরা সর্বোচ্চ পাঁচ দিনের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি হলে প্রয়োজনে সময় বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে বলেও তাঁদের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব অভিযোগ ও দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত পরিস্থিতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—
১. হামলার বিচার ও মামলা প্রত্যাহার: গত ২২ অক্টোবর অবরোধকারীদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি, অভিযোগের নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। এ ছাড়া হামলায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে দুই সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও তাঁদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে বদলির দাবিও রয়েছে।
২. ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ: উজো বাজারে দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বাজার এলাকা থেকে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবিও রয়েছে।
৩. আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ব্যয় বহন: আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, সংঘর্ষের ঘটনায় আহত নারী-পুরুষের চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার গ্রহণ করতে হবে।
৪. সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া: সাজেক থেকে জেএসএসের সন্তু লারমা-সমর্থিত সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও হয়রানির অভিযোগও তুলেছেন আন্দোলনকারীরা।
৫. গ্রেপ্তার ও হয়রানি বন্ধ: আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি বন্ধ, তাঁদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তল্লাশি বন্ধ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
এসব দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকায় সংকটের পূর্ণাঙ্গ সমাধান এখনো হয়নি।
সাজেক দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। সড়ক অবরোধের কারণে পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ থাকায় সেখানকার রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ, জিপগাড়ি ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
পর্যটকদের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় স্থানীয় পর্যটননির্ভর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক এবং পর্যটন খাতের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য মানুষের আয়-রোজগারে আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
রাঙামাটি জেলা প্রশাসন ২২ অক্টোবর থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেকে পর্যটকদের ভ্রমণ বন্ধ রাখার ঘোষণা দেয়। ফলে পর্যটনকেন্দ্রটি কবে আবার চালু হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচল ও প্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ সময় অবরোধ চললে খাদ্যপণ্য, ওষুধ এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে দুর্গম এলাকার মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। তাই সংকট নিরসনের আলোচনার পাশাপাশি জরুরি যানবাহন চলাচল এবং প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
সরকারি প্রতিনিধি দল ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে আলোচনায় কিছু অগ্রগতি হলেও অবরোধ প্রত্যাহারের নির্দিষ্ট সময় এখনো ঘোষণা করা হয়নি। সরকারি পক্ষ বাকি দাবিটি নিয়ে দ্রুত সমাধানের আশাবাদ জানালেও আন্দোলনকারীরা তাঁদের প্রধান দাবির বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ চান।
সাজেকের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রাখা, স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
তথ্যসূত্র: জাগো নিউজ২৪, দৈনিক নয়া দিগন্ত এবং Voice7 News।