নিজস্ব প্রতিবেদক | সংবাদ পোস্ট
প্রাকৃতিক খাদ্য হিসেবে মধুর প্রতি মানুষের আস্থা দীর্ঘদিনের। কেউ চিনির বিকল্প হিসেবে, কেউ দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায়, আবার কেউ স্বাস্থ্যগত উপকারের আশায় মধু কিনে থাকেন। কিন্তু সেই মধুতেই যদি বিপুল পরিমাণ চিনি মিশিয়ে ‘খাঁটি মধু’ হিসেবে বিক্রি করা হয়, তাহলে ভোক্তার আস্থা ও অর্থ—দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সম্প্রতি ফেনীর একটি আবাসিক হোটেলের টয়লেটে ভেজাল মধু তৈরির ঘটনা সামনে আসার পর বাজারে বিক্রি হওয়া মধুর বিশুদ্ধতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে ২ কেজি আসল মধুর সঙ্গে ১০ কেজি চিনি মিশিয়ে ১২ কেজি মধু তৈরি করা হতো। পরে তা খাঁটি মধু হিসেবে বাজারে বিক্রি করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রথম আলোর ২৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং পরবর্তী একটি মতামতধর্মী কলামে ঘটনাটি তুলে ধরা হয়েছে।
আসল মধু সংগ্রহের জন্য প্রাকৃতিক উৎস, মৌচাষ ও সংগ্রহপ্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করতে হয়। অন্যদিকে চিনি সহজলভ্য এবং তুলনামূলকভাবে সস্তা। এই পার্থক্যকে কাজে লাগিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা মধুতে চিনিজাতীয় উপাদান মিশিয়ে বেশি লাভের চেষ্টা করতে পারেন।
তবে ফেনীর ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের প্রশ্নই নয়, বরং মধু উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সরবরাহ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার তদারকি নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন। ভেজাল পণ্য কোথায় তৈরি হচ্ছে, কীভাবে বাজারে প্রবেশ করছে এবং কোন পর্যায়ে তা শনাক্ত করা সম্ভব—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি।
মধুর রং, ঘনত্ব, গন্ধ ও স্বাদ দেখে অনেকেই এর বিশুদ্ধতা বোঝার চেষ্টা করেন। পানিতে মিশিয়ে দেখা কিংবা ঠান্ডায় জমে যাওয়ার মতো কিছু ঘরোয়া পদ্ধতিও প্রচলিত। কিন্তু এসব পদ্ধতির মাধ্যমে মধু খাঁটি কি না, তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না।
কোন ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়েছে, এর উৎপত্তিস্থল কোথায় এবং কীভাবে তা প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণ করা হয়েছে—এসব কারণে মধুর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যে পার্থক্য দেখা দিতে পারে। একইভাবে সব ধরনের ভেজালও সাধারণ পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ে না।
বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের জন্য তাই প্রয়োজন উপযুক্ত পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণ। মধুর আর্দ্রতা, বিভিন্ন ধরনের চিনির অনুপাত, হাইড্রক্সিমিথাইল ফুরফুরাল (এইচএমএফ), পরাগরেণু এবং অন্যান্য রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করে এর মান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। প্রয়োজনে আইসোটপিক অ্যানালাইসিস ও ক্রোমাটোগ্রাফির মতো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিও ব্যবহার করা হয়।
মধুতে ভেজাল থাকলে ক্রেতা প্রত্যাশিত পণ্য থেকে বঞ্চিত হন। বিশেষ করে যারা চিনির বিকল্প ভেবে মধু কিনছেন, তাঁদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। চিনিযুক্ত মিশ্রণকে খাঁটি মধু হিসেবে বিক্রি করা হলে পণ্যের প্রকৃত উপাদান সম্পর্কে ভোক্তা বিভ্রান্ত হন।
তবে মধুতে চিনি থাকলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিষাক্ত হয়ে যায়—এমন সিদ্ধান্তও ঠিক নয়। ঝুঁকি নির্ভর করে মিশ্রণের প্রকৃতি, উপাদান, পরিমাণ ও ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর। অতিরিক্ত শর্করা গ্রহণের ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
প্রথম আলোয় প্রকাশিত কলামে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরীক্ষিত ১ হাজার ৭১৩টি খাদ্য নমুনার মধ্যে ৫৭১টিতে, অর্থাৎ প্রায় ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশে ভেজাল, দূষণ অথবা পুষ্টিমানসংক্রান্ত সমস্যা পাওয়া যায়। ওই নমুনাগুলোর মধ্যে মধুও ছিল বলে কলামে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত পরীক্ষা ও কার্যকর নজরদারির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। তবে নমুনার এই ফলাফল দিয়ে দেশের সব খাদ্যপণ্য বা সব মধুর মান সম্পর্কে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
মধু কেনার সময় কয়েকটি বিষয়ে নজর দেওয়া যেতে পারে—
ভেজাল প্রতিরোধে শুধু অভিযান চালিয়ে জরিমানা করাই যথেষ্ট নয়। নিয়মিত বাজার তদারকি, ঝুঁকিপূর্ণ উৎস থেকে নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভেজাল পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে উৎপাদক, পরিবেশক ও বিক্রেতার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।
মধুর মতো পরিচিত খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও যখন বিশুদ্ধতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়, তখন ভোক্তার পক্ষে একা তা যাচাই করা কঠিন। তাই নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্য নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি এবং ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো, মতামত বিভাগ—আফিফা খাতুনের ‘খাঁটি মধু কিনছি, নাকি চিনির সিরাপ?’ শীর্ষক কলাম। মূল লেখা পড়ুন।