বিদায়ের সুরে জাতিসংঘ প্রধান গুতেরেস, আলোচনায় গাজা উপত্যকা, এআই ও নিরাপত্তা পরিষদ
সংবাদ পোস্ট
-
প্রকাশ কাল:
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
-
৬
জন দেখেছেন
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৭৯তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া বিদায়ী ভাষণে বিশ্বনেতাদের প্রতি এক জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। মঙ্গলবার অধিবেশনের উদ্বোধনী বক্তব্যে নিজের ১০ বছরের দায়িত্বকালের খতিয়ান তুলে ধরে তিনি সতর্ক করে বলেন, “বর্তমান বৈশ্বিক সংকটের গভীর ফাটলগুলো এখন অতল খাদে রূপ নিয়েছে।”
পর্তুগালের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী আগামী ৩১ ডিসেম্বর মহাসচিব হিসেবে তাঁর দ্বিতীয় ও শেষ মেয়াদের সময়কাল পূর্ণ করতে যাচ্ছেন। ভাষণে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোকে কড়া বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, কেবল সামরিক, অর্থনৈতিক কিংবা প্রযুক্তিগত শক্তি দিয়ে আজকের বৈশ্বic সংকট সমাধান সম্ভব নয়। বিশ্বশক্তির ক্ষমতার যে সীমা রয়েছে, তা এখন পরাশক্তিগুলোর উপলব্ধি করা উচিত।
গাজা উপত্যকা ও সংঘাত বন্ধের তাগিদ
বিশ্বজুড়ে চলা বিভিন্ন সংঘাত বন্ধের জোর তাগিদ দিয়ে গুতেরেস বলেন, দ্বিমুখী নীতি পরিহার করে আন্তর্জাতিক আইন রক্ষা এবং ব্যতিক্রম ছাড়া সব সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দিতে হবে। সরাসরি ইসরায়েলের নাম না নিয়ে গাজা উপত্যকার ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর যে অভূতপূর্ব ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, তা তাঁর মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নজিরবিহীন। তিনি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) আদেশ মেনে গাজায় অবিলম্বে ত্রাণ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপন ও অন্যায় উচ্ছেদ বন্ধের তাগিদ দেন।
একইসঙ্গে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলাকে জাতিসংঘ সনদের চরম লঙ্ঘন আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, এই সংঘাতের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালিতে বহমান উত্তেজনা এড়াতে কূটনৈতিক আলোচনার আহ্বান জানান তিনি।
এআইয়ের ঝুঁকি ও কর্পোরেট প্রভাব
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির লাগামহীন ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে কার্যকর তদারকি কাঠামোর জোর তাগিদ দেন গুতেরেস। তিনি সতর্ক করে বলেন, বিশ্বের বর্তমান শাসনব্যবস্থা প্রযুক্তির অকল্পনীয় গতির সাথে খাপ খাওয়াতে পারছে না। ক্ষমতার প্রভাব রাষ্ট্রগুলোর হাত থেকে চলে যাচ্ছে গুটিকয়েক বেসরকারি সংস্থা ও ধনকুবেরদের হাতে। স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্ট ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো মারণাস্ত্র এখন সামরিক সত্যে পরিণত হয়েছে, যা মানবতার জন্য চরম ঝুঁকি। উল্লেখ্য, গুতেরেসের এই বার্তাটি এমন সময়ে এলো, যখন জাতিসংঘের ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ এআই বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বিশেষ ব্রিফিংয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার ও বৈশ্বিক অচলাবস্থা
জাতিসংঘের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও ভূ-রাজনৈতিক অচলাবস্থার চিত্র তুলে ধরে গুতেরেস উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক ক্ষমতা কাঠামো পরিবর্তন হলেও শাসনব্যবস্থা পুরোনো আমলেই রয়ে গেছে। জাতিসংঘের বার্ষিক এই উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে প্রায় ১৩০ জন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান সমবেত হলেও চীন, ভারত, জার্মানি ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশের শীর্ষ নেতারা সম্মেলন এড়িয়ে গেছেন।
ট্রাম্পসহ বিভিন্ন সমালোচকদের অর্থায়ন হ্রাস ও আক্রমণের প্রেক্ষাপটে গুতেরেস স্বীকার করেন, জাতিসংঘের যৌথ পদক্ষেপের প্রক্রিয়াগুলো চরম চাপের মুখে। তিনি ২১ শতকের পরিবর্তিত বাস্তবতায় নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার কোনো স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব না থাকাকে “চরম অন্যায্য” আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার ও একটি ভারসাম্যপূর্ণ বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার আহ্বান জানান।
শান্তির পক্ষে লড়ে যাওয়ার আবেগঘন ঘোষণা
ভাষণের শেষভাগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ধন্যবাদ জানিয়ে আবেগঘন কণ্ঠে গুতেরেস বলেন, “আগামী ১ জানুয়ারি যখন আমি আর মহাসচিব থাকব না, তখন নিশ্চিত থাকুন—আমি যেখানেই থাকি না কেন, শান্তি যে সম্ভব—সেই বিশ্বাসের পক্ষে আজীবন লড়ে যাব। জাতিসংঘের সনদের মূল মূল্যবোধ রক্ষায় আমি কখনো, কোনো অবস্থাতেই হাল ছাড়ব না।”
(সূত্র: রয়টার্স)
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
এ বিভাগের আরো খবর