আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সংবাদ পোস্ট
ইউরোপের দেশ স্পেনে দুটি দ্রুতগতির যাত্রীবাহী ট্রেনের ভয়াবহ সংঘর্ষে অন্তত ৬৮ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৮০ জন। বুধবার (২৮ অক্টোবর) দেশটির মধ্যাঞ্চলের তোলেদো প্রদেশের উর্দা এলাকার কাছে এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আটকে পড়া যাত্রীদের উদ্ধারে অভিযান চালান। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্ঘটনাটি চলতি বছরে স্পেনে দ্বিতীয় বড় ধরনের প্রাণঘাতী ট্রেন দুর্ঘটনা।
দুর্ঘটনায় দুটি দ্রুতগতির ট্রেনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সংঘর্ষের পর কয়েকটি বগি রেললাইন থেকে ছিটকে নিচের ঢালু স্থানে পড়ে যায়। ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, চিকিৎসাকর্মী ও অন্যান্য উদ্ধারকারী দল কাজ করে। আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন। দুর্ঘটনার ভয়াবহতায় দেশজুড়ে শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, স্পেনের রাষ্ট্রীয় রেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান রেনফের (Renfe) একটি দ্রুতগতির ট্রেন এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইরিওর (Iryo) পরিচালিত আরেকটি ট্রেন দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল।
মাদ্রিদ থেকে দক্ষিণাঞ্চলীয় আন্দালুসিয়ার দিকে যাওয়া ট্রেন দুটি একই রেলপথে চলছিল। একপর্যায়ে সামনে থাকা ইরিওর ট্রেনটি থেমে গেলে পেছন থেকে আসা রেনফের ট্রেন সেটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে একাধিক বগি লাইনচ্যুত হয় এবং কয়েকটি বগি রেললাইনের পাশের ঢালে পড়ে যায়।

সংঘর্ষের তীব্রতায় ট্রেনের বিভিন্ন অংশ দুমড়েমুচড়ে যায়। দুর্ঘটনাস্থলে ছড়িয়ে পড়ে ধাতব কাঠামোর ভাঙা অংশ ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ। আহত যাত্রীদের উদ্ধারে উদ্ধারকর্মীদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও সহায়তা করেন।
দুর্ঘটনার সময় দুটি ট্রেনে পাঁচ শতাধিক যাত্রী ছিলেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে উদ্ধারকাজের প্রাথমিক পর্যায়ে আশঙ্কা করা হয়েছিল।

স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে জানিয়েছেন, রেলপথের একটি অংশে নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যোগাযোগব্যবস্থায় কম্পিউটারজনিত ত্রুটি দেখা দিয়েছিল। এর ফলে প্রায় ৬৩ কিলোমিটার রেলপথজুড়ে ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি হয়।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ওই নিরাপত্তাব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে। পরিস্থিতির কারণে কয়েকটি ট্রেন থামিয়ে দেওয়া হয়। পরে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র থেকে রেনফের ট্রেনটিকে স্বাভাবিক গতিতে চলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল বলে পরিবহনমন্ত্রী জানিয়েছেন।
কিন্তু ওই সময় রেলপথে থামার সংকেত কার্যকর ছিল এবং সামনে অন্য একটি ট্রেন অবস্থান করছিল। এমন পরিস্থিতিতে ট্রেন চলাচলের অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পরিবহনমন্ত্রী ঘটনাটিকে অত্যন্ত অস্বাভাবিক বলে উল্লেখ করেছেন। তবে দুর্ঘটনার জন্য কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা কর্মকর্তাকে চূড়ান্তভাবে দায়ী করার আগে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে।

দুর্ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করা হয়। আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত বগিগুলোর ভেতরে আটকে পড়া যাত্রীদের উদ্ধারে কাজ করেন ফায়ার সার্ভিস ও জরুরি সেবাকর্মীরা।

গুরুতর আহতদের কয়েকজনকে নিবিড় চিকিৎসার প্রয়োজন হয়েছে। উদ্ধারকাজের পাশাপাশি নিহতদের পরিচয় শনাক্ত এবং তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দুর্ঘটনার কারণে মাদ্রিদ ও আন্দালুসিয়া অঞ্চলের মধ্যে দ্রুতগতির রেল চলাচল ব্যাহত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনাস্থল পরীক্ষা এবং তদন্তের স্বার্থে রেলপথের ওই অংশে চলাচল সীমিত রাখে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি দুর্ঘটনার কারণ উদ্ঘাটনে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন।
প্রাথমিকভাবে রেলপথের নিরাপত্তাব্যবস্থা, কম্পিউটার যোগাযোগে ত্রুটি এবং নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের সিদ্ধান্তের বিষয়গুলো তদন্তের আওতায় এসেছে। তবে এসবের মধ্যে কোন বিষয়টি সরাসরি দুর্ঘটনা ঘটাতে ভূমিকা রেখেছে, তা চূড়ান্ত তদন্তের আগে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
কেন একটি থেমে থাকা ট্রেনের পেছনে অন্য ট্রেনের সংঘর্ষ হলো এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা অকার্যকর থাকার পরও কীভাবে ট্রেন চলাচলের অনুমতি দেওয়া হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।

ভয়াবহ এ দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে স্পেনে ২৯ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। দেশটির সরকার দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে।
চলতি বছর একই দেশে আরেকটি বড় ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল। এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয় বড় ধরনের প্রাণঘাতী রেল দুর্ঘটনা দেশটির রেলব্যবস্থার নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
স্পেনের দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত। এমন ব্যবস্থায় পরপর প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটায় নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা এবং রেল পরিচালনায় ত্রুটি প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে নিরাপত্তাব্যবস্থার ত্রুটি দেখা দিলে কীভাবে ট্রেন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, সে বিষয়ে বিদ্যমান নিয়মকানুন পর্যালোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
এ মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আহতদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা, নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তা দেওয়া। একই সঙ্গে তদন্তের মাধ্যমে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
সূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ও আল জাজিরা; ২৮–২৯ অক্টোবর ২০২৬।