ব্যাংক খাতের আর্থিক দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা, আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এখন দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ১০ অক্টোবর রাজধানীর ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ওয়ান ব্যাংক আয়োজিত বাংলা কিউআর লেনদেনবিষয়ক এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতের ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম, অর্থ পাচার ও কাঠামোগত ক্ষতির কারণে এই পুনরুদ্ধার ব্যয় তৈরি হয়েছে।
গভর্নর বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার সময় ব্যাংকিং ব্যবস্থার মোট অর্থের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ইতোমধ্যে লুট হয়ে গিয়েছিল। তাঁর মতে, জনগণের অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরে গভর্নর বলেন, এই অর্থ দিয়ে প্রায় দুই কোটি পরিবারকে সহায়তা দেওয়া যেত অথবা দুটি পদ্মা সেতুর সমপরিমাণ বড় অবকাঠামো প্রকল্প নির্মাণ করা সম্ভব হতো। তাঁর বক্তব্যে ব্যাংক খাতের অনিয়মের কারণে দেশের অর্থনীতি ও জনকল্যাণমূলক ব্যয়ের ওপর চাপের বিষয়টি উঠে এসেছে।
ব্যাংকের এটিএম বুথ ও শাখা থেকে টাকা তুলতে না পারার বিষয়ে এক শিক্ষার্থীর প্রশ্নের জবাবে গভর্নর বলেন, কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের টাকা উত্তোলন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় ব্যাংকটি এখন গ্রাহকদের সব ধরনের উত্তোলনের চাহিদা পূরণ করতে পারছে বলে তিনি জানান।
এ ছাড়া ন্যাশনাল ব্যাংক ১৫ অক্টোবর থেকে গ্রাহকদের সব অর্থ ফেরত দিতে সক্ষম হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আরও বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা আগের লক্ষ্যের তুলনায় দুই লাখ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। দেশজুড়ে বাংলা কিউআর পদ্ধতি কার্যকরভাবে চালু করা গেলে এই লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে ৭ শতাংশের নিচে। বাংলা কিউআর ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবসায়িক লেনদেনের হিসাব আরও স্বচ্ছভাবে নথিভুক্ত করা গেলে এই অনুপাত ১০ শতাংশের বেশি করা সম্ভব হতে পারে।

ব্যাংক খাত পুনরুদ্ধারে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা জাতীয় বাজেট থেকে ব্যয় করতে হলে সরকারের ওপর উল্লেখযোগ্য আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। এই অর্থের সংস্থান, অন্যান্য উন্নয়ন ব্যয়ের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা এবং ব্যাংকগুলোর আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে এ ধরনের পুনর্গঠনের সাফল্য নির্ভর করবে খেলাপি ঋণ আদায়, আর্থিক অনিয়মের জবাবদিহি, ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসন এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ক্ষতি ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থার ওপর। তবে প্রতিবছর উল্লেখিত অর্থের প্রয়োজনীয়তা একটি সম্ভাব্য হিসাব; বাস্তবে কত অর্থ ব্যয় হবে, তা নির্ভর করবে পুনর্গঠন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ওপর।