পুঁজিবাজারে গুজব, অননুমোদিত পরামর্শ ও যাচাইহীন তথ্যের ভিত্তিতে বিনিয়োগের প্রবণতা কমাতে নিবন্ধিত আর্থিক পরামর্শক নিয়োগের বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে ‘রেজিস্টার্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজার রুলস’ প্রণয়ন ও জারির পরিকল্পনা রয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএসইসির কমিশনার নাফিজ আল তারিক বুধবার বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে এ পরিকল্পনার কথা জানান। তাঁর মতে, নতুন বিধিমালার মাধ্যমে আর্থিক পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহি বাড়ানো সম্ভব হবে।
লাইসেন্সপ্রাপ্ত পরামর্শকের মাধ্যমে বিনিয়োগের সুযোগ
বর্তমানে অনেক সাধারণ বিনিয়োগকারী ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের অনানুষ্ঠানিক পরামর্শ, পরিচিতজনের কথা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের ওপর নির্ভর করে শেয়ার কেনাবেচার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এসব তথ্য সব সময় নির্ভরযোগ্য বা যাচাই করা হয় না। ফলে ভুল সিদ্ধান্তে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি থাকে।
প্রস্তাবিত বিধিমালা কার্যকর হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ও তদারকির আওতায় নিবন্ধিত আর্থিক পরামর্শকের কাছ থেকে বিনিয়োগসংক্রান্ত পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এতে বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, বাজারের ঝুঁকি এবং বিনিয়োগের সম্ভাব্য ফলাফল বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন বলে আশা করছে বিএসইসি।
তবে বিধিমালাটি এখনো প্রণয়নের পরিকল্পনার পর্যায়ে রয়েছে। এর চূড়ান্ত শর্ত, নিবন্ধনের যোগ্যতা এবং পরামর্শকদের দায়িত্ব ও জবাবদিহির বিস্তারিত নিয়ম প্রকাশের পরই বিষয়গুলো স্পষ্ট হবে।
গুজবে বিনিয়োগ করে বড় ক্ষতির ঝুঁকি
বিএসইসি কমিশনার নাফিজ আল তারিক অনানুষ্ঠানিক পরামর্শের ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি তুলে ধরেন। সেমিনারে তিনি এমন এক জাতীয় পর্যায়ের পরিচিত ক্রিকেটারের উদাহরণ দেন, যিনি ব্যক্তিগত আস্থার ভিত্তিতে একটি ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের কাছে বিনিয়োগের অর্থ দিয়েছিলেন। পরে তাঁর বিনিয়োগের পোর্টফোলিওর মূল্য প্রায় ৮০ শতাংশ কমে যায় এবং ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে তিনি আর্থিক সংকটে পড়েন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনা থেকে বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, পরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা থাকলেও বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ও আর্থিক পণ্যের তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। শেয়ারবাজারে কোনো বিনিয়োগের লাভ নিশ্চিত নয়; বাজার পরিস্থিতি ও কোম্পানির কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করে লোকসানও হতে পারে।
বিনিয়োগে বৈচিত্র্য আনার পরামর্শ
সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিএসইসি কমিশনার। তাঁর মতে, অভিজ্ঞ সম্পদ ব্যবস্থাপকদের পরিচালিত বৈচিত্র্যপূর্ণ মিউচুয়াল ফান্ডের মাধ্যমে বিনিয়োগ করলে একক কোম্পানির শেয়ারে পুরো অর্থ বিনিয়োগ করার তুলনায় ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকে।
তবে মিউচুয়াল ফান্ডেও বাজারঝুঁকি রয়েছে। তাই বিনিয়োগের আগে ফান্ডের বিনিয়োগনীতি, ব্যবস্থাপনা ব্যয়, অতীত কার্যক্রম এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা নেওয়া জরুরি।
বিও হিসাবের তথ্য জানাতে আসছে সিডিবিএলের অ্যাপ
সেমিনারে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল মতলেব জানান, বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি মোবাইল অ্যাপ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। অক্টোবরের মধ্যেই অ্যাপটি চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অ্যাপটির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা তাঁদের বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব, শেয়ার পোর্টফোলিও এবং লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য দেখতে পারবেন। হিসাব থেকে অর্থ বা শেয়ার ডেবিট হওয়া এবং অন্যান্য লেনদেনের বিষয়ে বিজ্ঞপ্তিও পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
বর্তমানে এসব তথ্যের অনেকটাই এসএমএস ও ই-মেইলের মাধ্যমে জানানো হয়। নতুন অ্যাপ চালু হলে বিনিয়োগকারীদের নিজস্ব হিসাব পর্যবেক্ষণ আরও সহজ হতে পারে।
স্বচ্ছতা বাড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ
পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রাপ্তি, দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। নিবন্ধিত আর্থিক পরামর্শক চালুর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগসংক্রান্ত পরামর্শের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক তদারকি বাড়তে পারে।
তবে শুধু বিধিমালা প্রণয়ন করলেই গুজবনির্ভর লেনদেন বন্ধ হবে না। নিয়মের কার্যকর প্রয়োগ, বিনিয়োগকারীদের আর্থিক শিক্ষা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
বিএসইসির পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগকারীরা পেশাদার পরামর্শ নেওয়ার একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামো পাবেন। এখন নজর থাকবে বিধিমালাটি কবে চূড়ান্ত হয় এবং এর মাধ্যমে পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় কতটা পরিবর্তন আসে।