তবে এখন শুধু নতুন সফটওয়্যার তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; সরকারি ডিজিটাল ব্যবস্থাগুলো কোন অভিন্ন কাঠামো, প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নীতির ভিত্তিতে তৈরি হবে—সেই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রযুক্তিগত পরিকল্পনা ও অভিন্ন মানদণ্ড ছাড়া আলাদাভাবে সফটওয়্যার তৈরি হলে ভবিষ্যতে রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা, তথ্য আদান-প্রদান এবং বিভিন্ন সিস্টেমের মধ্যে সমন্বয়ের খরচ বাড়তে পারে। পরবর্তী সময়ে পুরোনো সফটওয়্যার পরিবর্তন বা অন্য সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত করতেও বাড়তি অর্থ ও সময় প্রয়োজন হতে পারে। সফটওয়্যার প্রকৌশলে ভবিষ্যতের এমন ব্যয় ও জটিলতাকে ‘টেকনিক্যাল ডেট’ বলা হয়।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার ভিন্ন ভিন্ন প্রযুক্তিতে তৈরি হওয়া নিজে বড় সমস্যা নয়। কোনো সিস্টেম জাভা, কোনোটি ডটনেট কিংবা পাইথনে তৈরি হতে পারে। মূল সমস্যা দেখা দেয় যখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিজেদের মতো করে ডেটাবেজ, এপিআই, পরিচয় যাচাই, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অডিট লগ ও তথ্যের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে।
এর ফলে একটি সফটওয়্যার নিজস্ব কাজ ঠিকভাবে করলেও অন্য সরকারি সিস্টেমের সঙ্গে তথ্য বিনিময় করতে গিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। ভবিষ্যতে পাঁচ বা দশ বছর পর কোনো পুরোনো সিস্টেমকে নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে গেলে ডেটার কাঠামো, পরিচয় যাচাই, নিরাপত্তা ও এপিআইয়ের পার্থক্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এ অবস্থায় একটি জাতীয় সফটওয়্যার আর্কিটেকচারকে প্রয়োজনীয় রেফারেন্স কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে সফটওয়্যার উন্নয়ন, সরকারি প্রযুক্তি ক্রয়, তথ্য বিনিময়, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে কিছু অভিন্ন নীতি নির্ধারণ করা সম্ভব হতে পারে।
এর পাশাপাশি প্রয়োজন জাতীয় সফটওয়্যার স্ট্যান্ডার্ড। সরকারি অর্থে তৈরি সফটওয়্যারের কোডের মান, ডকুমেন্টেশন, ভার্সনিং, টেস্টিং, লগিং, ব্যাকআপ, দুর্যোগ মোকাবিলা, স্কেলেবিলিটি, সোর্স কোড সংরক্ষণ এবং প্রকল্প শেষে হস্তান্তর ও রক্ষণাবেক্ষণের ন্যূনতম মান নির্ধারণের প্রস্তাবও সামনে এসেছে।
তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রেও অভিন্ন ডেটা স্ট্যান্ডার্ড গুরুত্বপূর্ণ। নাগরিক, প্রতিষ্ঠান, ঠিকানা, ভূমি, ব্যবসা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সংজ্ঞা ও কাঠামোতে সামঞ্জস্য না থাকলে শুধু প্রযুক্তিগতভাবে সিস্টেম যুক্ত করলেই কার্যকর ইন্টার–অপারেবিলিটি নিশ্চিত হবে না।
এ জন্য জাতীয় এপিআই স্ট্যান্ডার্ডের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি এপিআই কীভাবে তৈরি ও নথিভুক্ত হবে, সংস্করণ পরিবর্তন কীভাবে হবে, পরিচয় যাচাই ও অনুমোদনের নিয়ম কী হবে এবং পুরোনো এপিআই কীভাবে ধাপে ধাপে বন্ধ করা হবে—এসব বিষয়ে অভিন্ন নীতিমালা থাকলে সরকারি সিস্টেমগুলোর মধ্যে তথ্য ও সেবা বিনিময় সহজ হতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থাকেও একই কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। পরিচয় ও প্রবেশাধিকার ব্যবস্থাপনা, এনক্রিপশন, লগিং, দুর্বলতা ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ সফটওয়্যার উন্নয়নকে শুরু থেকেই ডিজিটাল সেবার নকশার অংশ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সরকারি সিস্টেমে একই ধরনের সুবিধা বারবার আলাদাভাবে তৈরি না করে লগইন, পরিচয় যাচাই, নোটিফিকেশন, ডিজিটাল স্বাক্ষর, পেমেন্ট ও অডিট লগের মতো কিছু সক্ষমতা পুনর্ব্যবহারযোগ্য ‘বিল্ডিং ব্লক’ হিসেবে তৈরি করার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
তবে জাতীয় পর্যায়ে এমন কাঠামো বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পুরোনো লিগ্যাসি সিস্টেম রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এতে সেবা ব্যাহত হওয়া, তথ্য হারানো, অতিরিক্ত ব্যয় ও প্রকল্প বিলম্বের ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই ধাপে ধাপে আধুনিকায়নের পাশাপাশি দক্ষ সফটওয়্যার আর্কিটেক্ট, সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও ডেটা ব্যবস্থাপনায় দক্ষ জনবল তৈরির প্রয়োজন রয়েছে।
একই সঙ্গে সরকারি ডেটা ব্যবহারের ক্ষেত্রে নাগরিকের গোপনীয়তা ও অধিকার নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কোন তথ্য কে, কী উদ্দেশ্যে এবং কোন আইনি ভিত্তিতে ব্যবহার করতে পারবে—এ বিষয়ে স্পষ্ট নিয়ম থাকা প্রয়োজন।
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে জাতীয় সফটওয়্যার আর্কিটেকচারকে স্থির কোনো নথি হিসেবে না দেখে নিয়মিত পর্যালোচনা ও হালনাগাদযোগ্য কাঠামো হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড, ডেটানির্ভর সেবা ও সাইবার নিরাপত্তা ভবিষ্যতের ডিজিটাল সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তাই সরকারি সফটওয়্যার উন্নয়নকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের বদলে নিরাপদ, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কাঠামোর অধীনে নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার প্রয়োজন রয়েছে।