প্রথম আলোর অনুসন্ধানে কুমিল্লা শহরে অন্তত ২০টি গ্যাং সক্রিয় থাকার তথ্য উঠে এসেছে। চলতি বছরের প্রায় নয় মাসে অন্তত ২৫টি আলোচিত অপরাধের ঘটনায় এসব দলের সদস্যদের নাম এসেছে। এ ছাড়া ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ১২টি হত্যাকাণ্ডে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের নাম পাওয়া গেছে। তবে ‘কিশোর গ্যাং’ বলা হলেও এসব দলের সব সদস্য কিশোর নয়; দলনেতাসহ অনেকের বয়স ১৮ বছরের বেশি।
সম্প্রতি স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জেলার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানে মোট ৬২৪ জনকে আটক করা হয়।
পুলিশের যাচাই-বাছাই শেষে বৃহস্পতিবার ৪৫১ জনকে মুচলেকায় অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ১৭৩ জনকে বিভিন্ন অভিযোগে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তবে আটক হওয়া ১৭৩ জনের সবাই কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত—এমন তথ্য পুলিশ নিশ্চিত করেনি। তাদের বিরুদ্ধে মাদক সেবন, নিয়মিত মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততাসহ বিভিন্ন অভিযোগে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, গত বছরের ৩০ নভেম্বর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কিশোর গ্যাংয়ের ২৫০ জনের বেশি সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর দাবি, গ্রেপ্তারের পর দ্রুত মুক্তি পেয়ে কেউ কেউ আবার একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। অনেকের অভিভাবককে ডেকে মুচলেকাও নেওয়া হয়েছে।
দেয়ালে গ্যাংয়ের পরিচয়
কুমিল্লা টাউন হলের পাশের মাঠঘেঁষা দেয়ালে কালো ও লাল রঙে ‘সিবিকে’, ‘ডিবিএক্স’ ও ‘কেজিএস’ লেখা রয়েছে। শহরের অন্য কয়েকটি দেয়ালেও একই ধরনের নাম দেখা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এসব নাম বিভিন্ন কিশোর ও তরুণ অপরাধী চক্রের পরিচয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অনলাইন ও টিকটকভিত্তিক গ্রুপের মাধ্যমেও তরুণদের সংগঠিত করার তথ্য পাওয়া গেছে। পরে দলবদ্ধভাবে রাস্তায় নামা, মোটরসাইকেলে মহড়া এবং অস্ত্র প্রদর্শনের মতো ঘটনাও ঘটেছে।
পুলিশের কাছে ‘সিবিকে’ ‘কুমিল্লা ব্রাদার্স কমিউনিটি’ নামে পরিচিত। ২০২৪ সালের অক্টোবরে তানজিম আবদুল্লাহ নামে এক গ্যাং নেতাকে গ্রেপ্তারের সময় পুলিশ জানিয়েছিল, তিনি সিবিকে ও এর অধীন কয়েকটি উপদলের নেতৃত্ব দিতেন। এসব দলের বিরুদ্ধে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক বিক্রি ও মোটরসাইকেলে মহড়ার অভিযোগ ছিল।
পুরোনো গ্যাং, তৈরি হচ্ছে নতুন উপদল
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ২০১৫ সালের দিকে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। সে সময় তিন থেকে চারটি দল বেশি সক্রিয় ছিল। ২০২২ সালের দিকে আলোচিত দলের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ২০টিতে পৌঁছায়।
বর্তমানে কিং স্কোয়াড, স্কোয়াড বা রতন গ্রুপ, ইগল, সিবিকে ও ক্রাইম সেটআপসহ কয়েকটি দলের নাম বেশি আলোচনায় রয়েছে। একই সদস্যকে একাধিক দলের সঙ্গে চলাফেরা করতে দেখা যাওয়ার তথ্যও রয়েছে। বড় দলের ভেতরেও আলাদা নামে উপদল গড়ে ওঠার ঘটনা ঘটছে।
পুলিশের হালনাগাদ তালিকা না থাকায় বর্তমানে ঠিক কতটি গ্যাং সক্রিয়, কোন দলের নেতৃত্বে কারা রয়েছে এবং সদস্যরা এক দল থেকে অন্য দলে যাচ্ছে কি না—তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না।
অপ্রতিম হত্যার পর নতুন অভিযান
কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম ১৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরদিন লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে দুজন অপ্রাপ্তবয়স্ক। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধান অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তদন্তে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার পাশাপাশি অপ্রতিমের সঙ্গে বয়সে বড়দের যোগাযোগ ও টিকটক ভিডিও তৈরির প্রলোভনের বিষয়ও সামনে এসেছে।
অপ্রতিম হত্যার পর কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠে। এর পরই কুমিল্লার ১৮ থানায় একযোগে অভিযান চালানো হয়।
অভিযানের পরও নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন
পুলিশ জানিয়েছে, মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়া কিশোরদেরও নজরদারিতে রাখা হবে। পাশাপাশি সপ্তাহে এক থেকে দুই দিন এ ধরনের অভিযান চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে সরকারি কৌঁসুলি কাইমুল হক মনে করেন, শুধু অভিযান চালালেই হবে না; মামলার এজাহারে অপরাধের সুনির্দিষ্ট বিবরণ এবং আসামির আগের অভিযোগের তথ্য যথাযথভাবে উল্লেখ করা জরুরি। তা না হলে গুরুতর অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরাও আইনি প্রক্রিয়ায় সুবিধা পেতে পারেন।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও বড় অভিযানের পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি ও অপরাধের যথাযথ তদন্তের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
এদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রথম দফার অভিযানে কিছু ত্রুটি নজরে এসেছে। সেগুলো কাটিয়ে পরবর্তী অভিযান আরও কার্যকর করার চেষ্টা থাকবে। পাশাপাশি গ্যাংয়ের নেতৃত্বে থাকা কিশোর ও তরুণদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার উদ্যোগও অব্যাহত থাকবে।