সংবাদ পোস্ট | অর্থনীতি ডেস্ক
ঢাকা, ১৬ অক্টোবর ২০২৬: বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, ঋণের সুদের হার বৃদ্ধির চাপ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিনিয়োগের সম্ভাব্য পরিবর্তন এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
ঢাকা পোস্টের ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইএমএফের আঞ্চলিক পূর্বাভাসে এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালের ৫ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে ৪.৮ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৪.৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম উঁচু থাকতে পারে। জ্বালানির জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো এতে বেশি চাপে পড়বে। কারণ, জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হলে উৎপাদন, পরিবহন এবং বিদ্যুৎ খাতের খরচও বেড়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি আমদানি ব্যয় ও সরকারি ভর্তুকির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এর প্রভাব পণ্য উৎপাদন, পরিবহন ভাড়া এবং বাজারদরের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালন খরচ বাড়তে পারে; একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
তবে জ্বালানির দাম বাড়লেই সব পণ্যের দাম একই হারে বাড়বে—এমন নয়। আন্তর্জাতিক বাজার, বিনিময় হার, সরবরাহব্যবস্থা এবং সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপরও এর প্রভাব নির্ভর করবে।
আইএমএফের চিহ্নিত আরেকটি ঝুঁকি হলো বৈশ্বিক বন্ডবাজারে সুদের হার বৃদ্ধি। বড় অর্থনীতিগুলোতে সরকারি ঋণবাজারের চাপ বাড়লে তার প্রভাব অন্যান্য দেশের অর্থায়ন ব্যবস্থায়ও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এতে সরকার ও বেসরকারি খাতের নতুন ঋণ নেওয়ার ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বিদ্যমান ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়তে পারে। যেসব দেশের রাজস্ব আয় তুলনামূলক কম এবং ঋণের চাহিদা বেশি, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ ও আর্থিক খাতের দুর্বলতা নিয়ে আইএমএফ উদ্বেগ জানিয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, দেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৭ শতাংশ। অর্থনীতির আকারের তুলনায় রাজস্ব আহরণ কম হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতে প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির বিস্তার বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করছে। চিপ উৎপাদন, ডেটা সেন্টার এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিপণ্যের চাহিদা বাড়ায় এশিয়ার কয়েকটি অর্থনীতি সুবিধা পেতে পারে।
তবে এআই খাতে বিনিয়োগের প্রত্যাশা পূরণ না হলে প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিনির্ভর দেশগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এশিয়ার দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
আইএমএফের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাত শক্তিশালী করা এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। শুধু কঠোর মুদ্রানীতি দিয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা যথেষ্ট নয়; পাশাপাশি আর্থিক ও কাঠামোগত সংস্কারও প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার নতুন আইএমএফ-সমর্থিত কর্মসূচি নিয়ে সংস্থাটির সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংক খাতের পুনঃমূলধনীকরণ, রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এসব আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ব্যাংককে আইএমএফের প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠকের পর জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সংস্কার ও উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা এগোচ্ছে। তবে নতুন কর্মসূচি চূড়ান্ত হওয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষা রয়েছে।
অর্থনৈতিক ঝুঁকি সামাল দিতে জ্বালানির উৎস বহুমুখী করা, সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা বাড়ানো, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কমানো এবং রাজস্ব আহরণ শক্তিশালী করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নিম্ন আয়ের পরিবারকে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়া এবং উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
জ্বালানি ও বৈশ্বিক সুদের চাপ কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তার ওপর পরিস্থিতির বড় অংশ নির্ভর করছে। তাই বর্তমান পূর্বাভাসকে নিশ্চিত অর্থনৈতিক মন্দা হিসেবে না দেখে সম্ভাব্য ঝুঁকির আগাম সংকেত হিসেবে বিবেচনা করাই যুক্তিযুক্ত।
তথ্যসূত্র: ঢাকা পোস্ট, ১৬ অক্টোবর ২০২৬; আইএমএফের এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস এবং ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ–বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভাসংক্রান্ত তথ্য।