বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিটের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘এআই অ্যান্ড ইনোভেশন ডায়ালগ’ অনুষ্ঠানে এ পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসাদ।
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে এবং কম্পিউটিং চিপ সংগ্রহের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়েছে। সরকার শুরুতেই বড় আকারের একটি এআই কেন্দ্র নির্মাণের পরিবর্তে তুলনামূলক ছোট ও ধাপে ধাপে সম্প্রসারণযোগ্য অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে।
বাংলা ভাষার এআই তৈরিতে গুরুত্ব
প্রস্তাবিত অবকাঠামোর অন্যতম লক্ষ্য হবে দেশের গবেষক ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের বাংলা ভাষাভিত্তিক বৃহৎ ভাষা মডেল (এলএলএম) তৈরি করার সুযোগ দেওয়া। এসব মডেল ব্যবহার করে বাংলা ভাষায় প্রশ্নোত্তর, তথ্য বিশ্লেষণ, অনুবাদ, লেখালেখি এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা তৈরি করা সম্ভব।
বর্তমানে উন্নত এআই সেবা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অনেকাংশে বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও তাদের অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করতে হয়। নিজস্ব কম্পিউটিং সক্ষমতা তৈরি করা গেলে স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী এআই মডেল উন্নয়ন, পরীক্ষা এবং পরিচালনার সুযোগ বাড়তে পারে।
বিশেষ করে বাংলা ভাষার উপাত্ত ব্যবহার করে তৈরি মডেল সরকারি নথি বিশ্লেষণ, শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা এবং গ্রাহকসেবার মতো ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে এসব ক্ষেত্রে কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য উপাত্ত, যথাযথ যাচাই এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা জরুরি হবে।
স্টার্টআপ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন সুযোগ
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, অবকাঠামোটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্টার্টআপ, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। ফলে নিজস্ব ব্যয়বহুল কম্পিউটিং ব্যবস্থা তৈরি করতে না পারা ছোট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানও এআইভিত্তিক পণ্য ও সেবা তৈরির সুযোগ পেতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা নতুন মডেল প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা এবং প্রযুক্তির কার্যকারিতা মূল্যায়নে এই সুবিধা ব্যবহার করতে পারবেন। শিক্ষার্থীদের জন্যও এআই গবেষণা ও ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, বেসরকারি খাত থেকে চাহিদা বাড়লে বাংলাদেশের মালিকানাধীন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও এই অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে কম্পিউটিং সুবিধা ব্যবহার করতে পারবে।
উন্নত চিপ সংগ্রহ বড় চ্যালেঞ্জ
আধুনিক এআই মডেল তৈরি ও পরিচালনার জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ) প্রয়োজন। এসব চিপের বৈশ্বিক চাহিদা বেশি থাকায় সরবরাহ পেতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। অর্থ থাকলেও কিছু উন্নত চিপের সরবরাহে কয়েক বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় বলে অনুষ্ঠানে উল্লেখ করা হয়।
এ কারণে সরকার উন্নত কম্পিউটিং চিপের পাশাপাশি মেমোরি চিপের সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়েও কাজ করছে। আগামী এক দশকের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে এসব উপকরণ সংগ্রহের ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
তবে চিপ সংগ্রহ নিশ্চিত করার ঘোষণা এবং বাস্তবে প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার স্থাপন এক বিষয় নয়। অবকাঠামো চালুর সময়সীমা ধরে রাখতে সরবরাহ, স্থাপন, পরীক্ষা এবং পরিচালনব্যবস্থা সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।
বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ
এআই অবকাঠামো পরিচালনায় বিপুল কম্পিউটিং সক্ষমতার পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও কার্যকর শীতলীকরণব্যবস্থা প্রয়োজন। ডেটা সেন্টারে যন্ত্রপাতি ঠান্ডা রাখতে পানি ব্যবহারের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সরকার জানিয়েছে, এআই অবকাঠামোর সম্ভাব্য স্থান নির্বাচনের সময় বিদ্যুৎ ও পানির প্রাপ্যতা বিবেচনা করা হচ্ছে। শুধু জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর নির্ভর না করে একাধিক বিদ্যুৎ উৎস এবং নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থার কথাও ভাবা হচ্ছে।
পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও শীতলীকরণ সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে এআই অবকাঠামোর পরিচালন ব্যয় বাড়তে পারে এবং সেবার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
সরকারি সেবায় এআই ব্যবহারের সম্ভাবনা
অনুষ্ঠানে সরকারি প্রশাসনে এআই ব্যবহারের সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়। সরকারি নথি বিশ্লেষণ, খসড়া প্রস্তুত, তথ্য অনুসন্ধান এবং বিভিন্ন সেবা দ্রুত দেওয়ার ক্ষেত্রে এআই সহায়ক হতে পারে।
ঢাকা ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা আশফাক জামান বলেন, বাংলাদেশে জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল আর্থিক সেবা, জাতীয় কিউআর কোড এবং ডিজিটাল নথি ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রয়েছে। এসব ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে এআই ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে সরকারি কাজে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা এবং সিদ্ধান্তের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। এআইয়ের দেওয়া তথ্য যাচাই না করে ব্যবহার করলে ভুল সিদ্ধান্ত বা নাগরিকের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকিও থাকতে পারে।
প্রযুক্তি ব্যবহার নয়, নিজস্ব সক্ষমতা গড়ার লক্ষ্য
বাংলাদেশের নিজস্ব এআই অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনাকে প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি দেশীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী মডেল তৈরি ও পরিচালনার সুযোগ পেতে পারে।
তবে প্রকল্পের সফলতা নির্ভর করবে উন্নত চিপের সরবরাহ, বিদ্যুৎ ও পানির স্থিতিশীল ব্যবস্থা, দক্ষ জনবল, উপাত্তের মান এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ওপর। পাশাপাশি এআই প্রযুক্তি যেন কেবল বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য ছোট উদ্যোক্তা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশাধিকারও গুরুত্বপূর্ণ।
আগামী ১২ মাসের মধ্যে অবকাঠামো চালুর লক্ষ্য সামনে রেখে এখন নজর থাকবে পরিকল্পনাটি কীভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং বাংলা ভাষায় কার্যকর, নিরাপদ ও স্থানীয় প্রয়োজনভিত্তিক এআই সেবা তৈরিতে কতটা অগ্রগতি আসে।