রাজধানীর তুরাগ নদ থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা কে এম তাহসিফ সাউরির (২৮) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। এ ঘটনায় পুলিশি হেফাজতে থাকা তাঁর বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেছেন, কিছু লোকের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। এ সময় তিনি নিজে সেখান থেকে পালিয়ে যান বলে জানিয়েছেন।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) জানিয়েছে, তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় একটি মোটরসাইকেল পাওয়া গেছে। গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিকভাবে মোটরসাইকেলটি তাহসিফের বলে ধারণা করা হলেও বিষয়টি যাচাই করা হচ্ছে।
ধাওয়াকারীরা পুলিশের লোক ছিলেন বলে দাবি
পিবিআইয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ বলেছেন, ঘটনার দিন তাঁরা ঘটনাস্থলে বসে কথা বলছিলেন। এ সময় কয়েকজন ব্যক্তি তাঁদের ধাওয়া করেন। তখন তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন এবং দীপ সেখান থেকে পালিয়ে যান।
দীপ আরও দাবি করেছেন, যাঁরা তাঁদের ধাওয়া করেছিলেন, তাঁরা পুলিশের সদস্য ছিলেন। তবে তাঁর দেওয়া বক্তব্যের সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যসহ ঘটনার অন্যান্য দিক যাচাই-বাছাই করছে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, তুরাগ নদের রাজবাড়ী ঘাট এলাকাটি মাদক কারবারের স্থান হিসেবে পরিচিত। তাঁদের ধারণা, মাদক কারবারিদের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ নদীতে পড়ে ডুবে যেতে পারেন। তবে তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে।
যেভাবে নিখোঁজ হয়েছিলেন তাহসিফ
তাহসিফ গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর উত্তরায় নিজের বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। ওই দিন দিবাগত রাত ১টা ৩৫ মিনিটে মাকে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে তিনি বাসায় ফিরছেন বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু এরপর আর বাসায় ফেরেননি।
পরদিন বুধবার বিকেলে উত্তরখান থানার রাজবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ।
বাসা থেকে বের হওয়ার সময় তাহসিফ মোটরসাইকেল নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু মরদেহ উদ্ধারের পর পরিবারের সদস্যরা জানান, তাঁর মোটরসাইকেলটির কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে পিবিআই রাজবাড়ী ঘাটের কাছাকাছি টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করে। সেটি তাহসিফের কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
সিসিটিভি ফুটেজে দীপের সঙ্গে দেখা যায় তাহসিফকে
তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে তাঁকে এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা যায়। পরিবারের সদস্যরা ওই ব্যক্তিকে দীপ হিসেবে শনাক্ত করেন।
ফুটেজে দেখা যায়, মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের একটি গ্যারেজের সামনে তাহসিফের সঙ্গে ওই ব্যক্তির দেখা হয়। তাঁরা পরস্পরের সঙ্গে হাত মেলানোর পর পৃথক দুটি মোটরসাইকেলে করে সেখান থেকে চলে যান।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দীপকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার একটি বাসা থেকে নিয়ে যায় পিবিআই। ঘটনার আগের রাতে তাঁরা একসঙ্গে বের হয়েছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে কী ঘটেছিল, তা জানতেই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, সিসিটিভি ফুটেজে তাহসিফের মোটরসাইকেলের পেছনে নম্বর প্লেট দেখা যায়নি। উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটির পেছনেও নম্বর প্লেট ছিল না।
মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ পরিবারের
তাহসিফের মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তাঁর বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। তিনি মনে করেন, এটি আত্মহত্যা নয়। সরকারের মাধ্যমে সুষ্ঠু তদন্ত হলে প্রকৃত অপরাধীদের খুঁজে বের করা সম্ভব হবে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
গত বৃহস্পতিবার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে তাহসিফের মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। জানাজা শেষে ওই দিনই রাজধানীর উত্তরায় তাঁকে দাফন করা হয়।
তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় এখনো তদন্ত চলছে। দীপের বক্তব্য, মোটরসাইকেল উদ্ধার এবং অন্যান্য আলামত যাচাই করে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সূত্র: প্রথম আলো /অপরাধ