সংবাদ পোস্ট | আন্তর্জাতিক
হরমুজ প্রণালিতে সমুদ্রের মাইনে আঘাত লেগে গত ২৪ ঘণ্টায় তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নৌবাহিনী। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজ চলাচল নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই নতুন করে সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দেওয়া এক বিবৃতিতে আইআরজিসির নৌবাহিনী জানায়, ট্যাংকারগুলো হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ দিকের একটি অননুমোদিত পথ দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করছিল। এ সময় সমুদ্রের মাইনে আঘাত লেগে জাহাজগুলোতে বিস্ফোরণ ও আগুনের সূত্রপাত হয় বলে তাদের দাবি। তবে তিনটি জাহাজেই মাইনের আঘাত লেগেছিল কি না, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, ওমানের খাসাব উপকূল থেকে প্রায় ৯ নটিক্যাল মাইল উত্তরে হরমুজ প্রণালির কাছে একটি জাহাজে আগুন লাগার খবর তারা পেয়েছে। তবে এই ঘটনায় জড়িত জাহাজটির সঙ্গে ইরানের দাবিতে উল্লেখ করা তিনটি ট্যাংকারের সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও ওমানের কাছাকাছি একটি ট্যাংকারে আগুন লাগার খবর উঠে এসেছে। তবে ঘটনাগুলোর মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
জাহাজের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা বন্ধ থাকার দাবি
আইআরজিসির নৌবাহিনীর দাবি, সংশ্লিষ্ট ট্যাংকারগুলো তাদের রাডার ও নৌ-চলাচলসংক্রান্ত প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা বন্ধ রেখেছিল। পাশাপাশি ইরানি নৌবাহিনীর সতর্কতা উপেক্ষা করে তারা ওমানের উপকূলসংলগ্ন একটি অননুমোদিত নৌপথ দিয়ে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছিল।
ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের পর জাহাজগুলোর পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে ক্রুরা জাহাজ ছেড়ে চলে যান এবং সেগুলো প্রণালির দক্ষিণ অংশে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে জাহাজগুলোর নাম, মালিকানা, পতাকাবাহী দেশ এবং ক্রুদের নিরাপত্তা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না, সে বিষয়েও নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ ইরানের
এই ঘটনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডকে (সেন্টকম) দায়ী করেছে ইরান। আইআরজিসির অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিরাপত্তাসংক্রান্ত আশ্বাস দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে মাইন-ঝুঁকিপূর্ণ দক্ষিণের নৌপথ ব্যবহার করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
তবে ইরানের এই অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ এবং এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টিকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
যুদ্ধের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে বাড়ছে ঝুঁকি
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে এই জলপথের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এখানে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাজারে তার প্রভাব পড়তে পারে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। ইরান এই জলপথে চলাচল সীমিত করার চেষ্টা করছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ আরোপ করেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সামুদ্রিক মাইন, অজ্ঞাত হামলা এবং জাহাজে অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনা আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়াচ্ছে।
ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের অপেক্ষা
হরমুজ প্রণালিতে তিনটি ট্যাংকারে মাইন বিস্ফোরণের বিষয়ে ইরানের দাবি এবং ওমানের কাছে একটি জাহাজে আগুন লাগার বিষয়ে ইউকেএমটিওর তথ্য—দুটি বিষয় আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর পরিচয়, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, ক্রুদের অবস্থা এবং বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া গেলে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট হবে।
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তিনটি ট্যাংকারেই মাইনের আঘাতে বিস্ফোরণ ঘটেছে—এমন সিদ্ধান্ত স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের পরই এ বিষয়ে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য জানা সম্ভব হবে।
বিভাগ: আন্তর্জাতিক
সূত্র: ইরানের আইআরজিসির নৌবাহিনীর বিবৃতি, যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (UKMTO) এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন।