ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে সৌদি আরবের যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। হামলার ঝুঁকি বিবেচনায় তাঁকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে বাংকার-সুবিধাসম্পন্ন বিভিন্ন রাজপ্রাসাদে স্থানান্তর করা হচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর তথ্যের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে যুবরাজের চলাচল ও অবস্থান গোপন রাখা হচ্ছে। তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষভাবে নির্বাচিত একটি দক্ষ নিরাপত্তা দল দায়িত্ব পালন করছে।
রিয়াদ বিমানবন্দরে ভয়াবহ হামলা
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। প্রতিবেদনে হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
হামলার পর থেকে বিমানবন্দরটির কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। উড়োজাহাজ চলাচলবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতির কারণে রিয়াদ বিমানবন্দরের নির্ধারিত ফ্লাইটের প্রায় ৬০ শতাংশ বাতিল করতে হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
হুতিদের এক মুখপাত্র রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার দায় স্বীকার করেছেন। পাশাপাশি সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে হামলা অব্যাহত রাখার হুমকিও দিয়েছেন তিনি।
জনসমক্ষে নেই যুবরাজ, বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার একটি জাতীয় রক্তদান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর থেকে মোহাম্মদ বিন সালমানকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। হুতিদের সঙ্গে সংঘাত তীব্র হওয়ায় তাঁর নিরাপত্তাব্যবস্থায় বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে জানানো হয়েছে।
তবে যুবরাজের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিক সাড়া মেলেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সামরিক সহায়তা চাইছে সৌদি আরব
ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করতে গিয়ে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির কর্মকর্তারা আকাশ প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে আসার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এই পরিস্থিতিতে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিসরের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে রিয়াদ। একই সময়ে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও চাপে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার বরাতে জানানো হয়েছে।
সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান বলেছেন, হুতিদের হামলার ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে সৌদি আরবও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে।
যুদ্ধবিরতি ভেঙে নতুন করে সংঘাত
ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের মধ্যে ২০২২ সালে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে আঞ্চলিক উত্তেজনা ও ইরানকে ঘিরে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সেই সমঝোতা কার্যত ভেঙে পড়ে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইয়েমেনের সানা বিমানবন্দর থেকে হুতিদের প্রতিনিধিদের নিয়ে তেহরানগামী একটি ইরানি উড়োজাহাজ উড্ডয়নের চেষ্টা করলে সৌদি বাহিনী গুলি চালিয়েছিল বলে হুতিদের অভিযোগ। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ে।
অন্যদিকে, সংঘাত প্রশমনে কূটনৈতিক উদ্যোগও অব্যাহত রয়েছে। সৌদি আরব ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে টেলিফোনে আলোচনা হয়েছে। ইরান রাজনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে এবং রিয়াদ ও হুতিদের মধ্যে সংলাপ প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতার আগ্রহ জানিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান এই সংঘাতের পরিণতি এখনো অনিশ্চিত। সৌদি আরবের নিরাপত্তা, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর কূটনৈতিক অবস্থান আগামী দিনের পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র: প্রথম আলো, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদন।
মূল প্রতিবেদন: https://www.prothomalo.com/world/middle-east/1v9hwj1ar3