সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে দেশের শিক্ষাঙ্গনে উপাচার্য ও প্রশাসনিক পদে পরিবর্তন এলেও শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতির প্রভাব পুরোপুরি কাটেনি। বরং সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে শিক্ষক নিয়োগ, পদায়ন, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থাকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই বছরে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য পরিবর্তন হয়েছে একাধিকবার। একই সময়ে ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক তৎপরতার অভিযোগ তদন্তের বিষয়টি সামনে এসেছে। শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতির প্রভাবের পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের অবনতির ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, রাজনৈতিক মতপ্রকাশ বা সংগঠনের অধিকার থাকলেও সমস্যা তৈরি হয় যখন রাজনৈতিক পরিচয় শিক্ষকের পেশাগত যোগ্যতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। উপাচার্য নিয়োগ, শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি কিংবা প্রশাসনিক দায়িত্বে দলীয় পরিচয় প্রাধান্য পেলে পুরো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মতে, একদিকে সরকার নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতে চায়, অন্যদিকে কিছু শিক্ষকও পদ-পদবির জন্য রাজনৈতিক আনুকূল্য খোঁজেন। এর ফলে শিক্ষাঙ্গনে দলবাজির পরিবেশ তৈরি হয়।
শিক্ষকদের হেনস্তা ও তদন্ত
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসায় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে তদন্ত, বরখাস্ত, দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া, পদত্যাগে বাধ্য করা এবং হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে। কিছু ক্ষেত্রে অপরাধ, অনিয়ম বা অসদাচরণের অভিযোগ থাকলেও অন্য কিছু ঘটনায় রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় সম্পৃক্ততার বিষয় সামনে এসেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত দুই বছরে অন্তত ৩২ জন শিক্ষককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখাসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩১ জন আওয়ামীপন্থী শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও উঠেছে। ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষকের কথিত রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়েও তদন্তের বিষয় সামনে এসেছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ও ঘটনায় ৩৮ জন শিক্ষক-কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে এসেছে। এর মধ্যে কয়েকজনকে বরখাস্ত, অনেকে সাময়িক বরখাস্ত বা দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। এছাড়া প্রায় ৩০০ শিক্ষকের একটি তালিকাও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গত দুই বছরে শিক্ষকদের ঘিরে একাধিক ঘটনায় উত্তেজনা, বিক্ষোভ, হেনস্তা ও তদন্ত হয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্তের পর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শতাধিক শিক্ষকের বিরুদ্ধে গঠিত অনুসন্ধান বা তদন্ত কমিটির আইনগত বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে প্রশ্ন উঠেছে। ২১ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে রুল জারি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক দলাদলি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ নেই। সরকার পরিবর্তনের পর বিভিন্ন বেসরকারি স্কুল-কলেজেও শিক্ষকদের হেনস্তা, জোর করে পদত্যাগ করানো, বরখাস্ত এবং দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
‘পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক জোট’-এর দাবি অনুযায়ী, তাদের সংগঠনে প্রায় ৩০০ ভুক্তভোগী শিক্ষক রয়েছেন। সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯৫০ শিক্ষকের এমপিও বন্ধ রয়েছে এবং আরও প্রায় সাড়ে চার হাজার শিক্ষকের বেতন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বন্ধ রয়েছে।
শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কোনো শিক্ষক অপরাধ, দুর্নীতি, সহিংসতা বা দায়িত্বে গুরুতর অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকলে অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে সেই বিচার হতে হবে নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণ এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগের ভিত্তিতে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক প্রভাব, দলাদলি ও শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের অবনতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা ও পেশাগত স্বাধীনতাকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে রাখতে না পারলে শিক্ষার পরিবেশ ও প্রতিষ্ঠানের মান—দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।