অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কমিটি গত বুধবার (৭ অক্টোবর) এ ঋণের অনুমোদন দেয়। শুক্রবার প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টার ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সরকারের লক্ষ্য, অর্থায়নের ব্যবস্থা করে জ্বালানি আমদানিতে বিঘ্নের ঝুঁকি কমানো এবং দেশের জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখা।
কোন প্রতিষ্ঠান কত টাকা পাবে
অনুমোদিত ৩১০ কোটি ডলারের মধ্যে ২৫০ কোটি ডলার পাবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এই অর্থ দিয়ে জ্বালানি তেল আমদানি করা হবে। বাকি ৬০ কোটি ডলার পাবে পেট্রোবাংলা, যা এলএনজি কেনার কাজে ব্যবহার করা হবে।
ঋণটির অর্থায়নে যুক্ত রয়েছে জেদ্দাভিত্তিক আন্তর্জাতিক ইসলামি বাণিজ্য অর্থায়ন করপোরেশন (আইটিএফসি)। এটি ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গ্রুপের বাণিজ্য অর্থায়ন সংস্থা।
অর্থায়ন কাঠামো অনুযায়ী, আইটিএফসি নিজস্ব তহবিল থেকে ৬০ কোটি ডলার দেবে। অবশিষ্ট ২৫০ কোটি ডলার বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সহ-অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হবে।
ঋণের সুদ ও পরিশোধের শর্ত
এই ঋণ প্রচলিত বাজারভিত্তিক শর্তে নেওয়া হচ্ছে। ছয় মাস মেয়াদি টার্ম এসওএফআর হারের সঙ্গে অতিরিক্ত ১ দশমিক ৭০ শতাংশ সুদ যোগ হবে। ১ অক্টোবরের ছয় মাস মেয়াদি এসওএফআর হার ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ ধরে ঋণের প্রাথমিক বার্ষিক সুদের হার দাঁড়ায় প্রায় ৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ। এর সঙ্গে বার্ষিক প্রশাসনিক ফিও দিতে হবে।
ঋণের প্রতিটি অর্থছাড়ের অর্থ ছয় মাস শেষে এককালীন পরিশোধ করার শর্ত রয়েছে। পরবর্তী সময়ে ঋণ নবায়ন বা পুনঃঅর্থায়ন করা হলে অর্থায়নের ব্যবস্থা চালু রাখা সম্ভব হবে। তবে এতে সুদ, পুনঃঅর্থায়নের শর্ত এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ বিবেচনায় রাখতে হবে।
জরুরি জ্বালানি চাহিদা মেটাতে উদ্যোগ
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন এবং শিল্পকারখানার কার্যক্রমে জ্বালানি তেল ও গ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানির অর্থের ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে।
এ কারণে জ্বালানি আমদানির অর্থায়ন নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্ট কমিটি জরুরি ভিত্তিতে প্রস্তাবটি বিবেচনা করে অনুমোদন দিয়েছে। তবে ঋণ অনুমোদনের অর্থ এই নয় যে জ্বালানির দাম কমে যাবে; বরং এর প্রধান উদ্দেশ্য আমদানির অর্থ জোগান নিশ্চিত করা।
বিদেশি ঋণের সঙ্গে বাড়ছে আর্থিক দায়
জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখার ক্ষেত্রে এই অর্থায়ন সহায়ক হলেও ঋণটির শর্ত ও পরিশোধের সময়সীমা গুরুত্বপূর্ণ। স্বল্পমেয়াদি ঋণের অর্থ সময়মতো পরিশোধ করতে না পারলে পুনঃঅর্থায়নের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আমদানি ব্যয় এবং সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর নজর রাখা প্রয়োজন।
সরকারের সামনে তাই দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে—একদিকে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখা, অন্যদিকে ঋণের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার এবং নির্ধারিত সময়ে দায় পরিশোধ নিশ্চিত করা।
বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার জন্য আরও ২০ কোটি ডলার
জ্বালানি আমদানির ঋণের পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছ থেকে আরও ২০ কোটি ডলার ঋণ নেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। ফলে জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ বিতরণ অবকাঠামো উন্নয়নে অনুমোদিত ঋণের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৩০ কোটি ডলার।
বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নতুন ও বিদ্যমান সাবস্টেশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন সম্প্রসারণ, ডিজিটাল পর্যবেক্ষণব্যবস্থা এবং ত্রুটি শনাক্ত করার প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের প্রত্যাশা, এসব উদ্যোগ জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা বাড়াতে সহায়তা করবে। তবে এর বাস্তব সুফল নির্ভর করবে ঋণের সঠিক ব্যবহার, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং আর্থিক দায় কার্যকরভাবে পরিচালনার ওপর।