নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় মাদ্রাসার ছাদে খেলতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দগ্ধ পাঁচ কিশোরীর মধ্যে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মর্মান্তিক ওই ঘটনায় তিন দিনে তিন কিশোরীর মৃত্যু হলো।
বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় লামিয়া (১৩) মারা যায়। চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তার শরীরের প্রায় ৫৫ শতাংশ ইলেকট্রিক ফ্ল্যাশ বার্নে দগ্ধ হয়েছিল। গুরুতর অবস্থায় সে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল।
এর আগে মঙ্গলবার বিকেলে একই ঘটনায় দগ্ধ আতিয়া (১১) মারা যায়। পরদিন বুধবার সকালে মারা যায় জিদনী আক্তার (১৪)। ফলে দুর্ঘটনায় দগ্ধ পাঁচ কিশোরীর মধ্যে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। বাকি দুজন সুমাইয়া ও আছিয়া চিকিৎসাধীন।
গত শনিবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার কাশিপুর ইউনিয়নের হাজীপাড়া এলাকায় মাহেলা খাতুন বালিকা মাদ্রাসার তিনতলা ভবনের ছাদে খেলছিল কয়েকজন ছাত্রী।
বিকেলে কয়েকজন বাচ্চা ছাদে খেলতে গেলে বৈদ্যুতিক তারের সংস্পর্শে পাঁচজন আহত হয়। তাদেরকে রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। রোববার সকালে চিকিৎসার অগ্রগতি জানা যাবে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
মুফতি আবদুর রহমান, পরিচালক, হাজীপাড়া এলাকায় মাহেলা খাতুন বালিকা মাদ্রাসাতিন বছর আগে মাদ্রাসা ভবনটি দোতলা থেকে তিনতলা করার উদ্যোগ নেয় কর্তৃপক্ষ। খবর পেয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন এসে আপত্তি জানান। এরপরও ভবনটি শেষ পর্যন্ত তিনতলা করা হয়। মাদ্রাসা ভবনের ওপর দিয়ে ১ লাখ ৩২ হাজার ভোল্টের ছয়টি সঞ্চালন তারের মধ্যে দুটি অপেক্ষাকৃত নিচু দিয়ে গেছে।
ওই ছাদের খুব কাছ দিয়ে উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন চলে গেছে। ছয়টি সঞ্চালন তারের মধ্যে দুটি অপেক্ষাকৃত নিচু দিয়ে যাওয়ায় ছাদটি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কোনোভাবে তারের সংস্পর্শে এলে পাঁচ কিশোরী বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গুরুতর দগ্ধ হয়।
দুর্ঘটনার পর পাঁচজনকেই দ্রুত রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একে একে তিনজনের মৃত্যু হয়।
প্রথম আলোর অনুসন্ধান অনুযায়ী, মাদ্রাসা ভবনটি দোতলা থেকে তিনতলা করার সময়ই বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়েছিল। কারণ, ভবনের ছাদের খুব কাছ দিয়ে ১ লাখ ৩২ হাজার ভোল্টের সঞ্চালন লাইন চলে গেছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী জানিয়েছেন, সঞ্চালন লাইনের নিচে থাকা স্থাপনাগুলো ঝুঁকিপূর্ণ এবং সেগুলো সরিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে ভবনের উচ্চতা নিয়ে কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি বলেও জানিয়েছেন তিনি।
দুর্ঘটনার পর ছাদে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সেখানে একটি বাগান ও মাছ চাষের ব্যবস্থা ছিল। পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ছাদে গিয়ে গাছে পানি দেওয়া ও অন্যান্য কাজে অংশ নিত।
তবে মাদ্রাসার পরিচালক আবদুর রহমান কাসেমীর দাবি, ছাদ সাধারণত তালাবদ্ধ রাখা হতো। দুর্ঘটনার দিন শিক্ষার্থীরা ভেতর থেকে চাবি নিয়ে ছাদে গিয়েছিল বলে তিনি জানান।
ঘটনার পর মাদ্রাসা এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফতুল্লা মডেল থানার পুলিশ জানিয়েছে, নিহতদের ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া চলছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করার বিষয়ে আলোচনা চলছিল; স্বজনেরা মামলা না করলে পুলিশ নিজ উদ্যোগেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনা শুধু তিন কিশোরীর প্রাণই কেড়ে নেয়নি, বরং উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ লাইনের নিচে ভবন নির্মাণ এবং শিশু-কিশোরদের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে চলাচল নিয়ন্ত্রণে কতটা সতর্কতা প্রয়োজন, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।