আজ ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস। ১৯৬৬ সালের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ছয় দফা দাবির সমর্থনে পূর্ব বাংলাজুড়ে গণআন্দোলনের সূচনা হয়। বাঙালির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উত্থাপিত এই ছয় দফাকেই পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সংগঠন শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা ও স্মরণ কর্মসূচির আয়োজন করেছে।
১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের লাহোরে বিরোধী দলগুলোর এক সম্মেলনের সাবজেক্ট কমিটিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা কর্মসূচি উত্থাপন করেন। তবে সম্মেলনের আয়োজকেরা বিষয়টি আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে অস্বীকৃতি জানালে তিনি সম্মেলন বর্জন করে নিজ উদ্যোগে কর্মসূচিটি জনসমক্ষে তুলে ধরেন।
পরে ঢাকায় ফিরে ১৩ মার্চ আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় ছয় দফা ও সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির অনুমোদন নেওয়া হয়। এর পরপরই পূর্ব বাংলার বিভিন্ন জেলায় সফর করে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের নেতারা ছয় দফার পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন। তাঁরা একে ‘বাঙালির মুক্তির সনদ’ হিসেবে অভিহিত করেন।
ছয় দফার মূল প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ছিল প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র ছাড়া অধিকাংশ ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের হাতে ন্যস্ত করা, দুই অঞ্চলের জন্য পৃথক মুদ্রা বা কার্যকর মুদ্রা ব্যবস্থা, কর ও শুল্ক আদায়ের ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের হাতে দেওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পৃথক হিসাব সংরক্ষণ। পাশাপাশি পূর্ব বাংলার নিরাপত্তা জোরদারে আধা-সামরিক বাহিনী গঠন ও নৌবাহিনীর সদর দপ্তর স্থাপনের দাবিও ছিল এতে।
ছয় দফা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দমন-পীড়নও বৃদ্ধি পায়। বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হন। আন্দোলনের অংশ হিসেবে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন আওয়ামী লীগের ডাকা হরতালে টঙ্গি, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে পুলিশ ও ইপিআরের গুলিতে মনু মিয়া, শফিক, শামসুল হকসহ ১১ জন নিহত হন। তাঁদের আত্মত্যাগ ছয় দফা আন্দোলনকে আরও বেগবান করে।
পরবর্তী সময়ে এই আন্দোলনই ধাপে ধাপে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের সাধারণ নির্বাচন এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত্তি রচনা করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের মধ্য দিয়ে ছয় দফার প্রতি বাঙালির সমর্থন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কিন্তু নির্বাচনে বিজয়ী দলকে ক্ষমতা হস্তান্তরে পাকিস্তানি শাসকদের অনীহার ফলে রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হয়। এর ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে শুরু হয় স্বাধীনতার আন্দোলন, যা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে পরিণত হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছয় দফা ছিল বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সুস্পষ্ট রূপরেখা। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এটি কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিই নয়, বরং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ