ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে বল নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ের মধ্যে বল নির্বাচন নিয়েও মতবিরোধ হয়েছিল। প্রায় এক শতাব্দী পর বিশ্বকাপের বল এখন প্রযুক্তির নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপের অফিসিয়াল ম্যাচ বল ‘ট্রাইওন্ডা’ তারই সর্বশেষ উদাহরণ।
ক্রীড়াসামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস তৈরি করেছে এই বল। উন্নত সেন্সর প্রযুক্তি ও আধুনিক নকশার কারণে ট্রাইওন্ডাকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আধুনিক ‘স্মার্ট বল’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বলটির নামকরণেও রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। ইংরেজি শব্দ ‘ট্রাই’ এবং স্প্যানিশ শব্দ ‘ওন্ডা’ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে ‘ট্রাইওন্ডা’। এখানে ‘ট্রাই’ দিয়ে বোঝানো হয়েছে ২০২৬ বিশ্বকাপের তিন স্বাগতিক দেশ—কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রকে। আর ‘ওন্ডা’ শব্দের অর্থ ঢেউ। সব মিলিয়ে নামটি তিন দেশের যৌথ আয়োজন ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
বলের নকশায়ও উঠে এসেছে তিন দেশের পরিচয়। এতে ব্যবহার করা হয়েছে কানাডার ম্যাপল লিফ, মেক্সিকোর ঈগল এবং যুক্তরাষ্ট্রের তারার প্রতীক। লাল, সবুজ ও নীল রঙের সমন্বয়ে তৈরি নকশা বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজনকে প্রতিফলিত করেছে।
ট্রাইওন্ডার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য এর ভেতরে থাকা ‘কানেক্টেড বল’ প্রযুক্তি। বলটিতে ব্যবহৃত ৫০০ হার্টজের মোশন সেন্সর প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম। বলের গতি, অবস্থান, স্পর্শ ও গতিপথ–সংক্রান্ত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) সিস্টেমে পাঠানো হবে। এর ফলে অফসাইড, হ্যান্ডবল কিংবা বল স্পর্শ–সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত আরও দ্রুত ও নির্ভুলভাবে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
স্মার্ট বল প্রযুক্তি প্রথমবার পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল ২০২২ বিশ্বকাপে। তবে ট্রাইওন্ডায় সেই প্রযুক্তির আরও উন্নত সংস্করণ যুক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে অ্যাডিডাস। এতে ম্যাচ পরিচালনায় রেফারিদের কাজ আরও সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বলটির আরেকটি বৈশিষ্ট্য এর চার-প্যানেলের গঠন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এত কম প্যানেলযুক্ত বল আগে ব্যবহার হয়নি। অ্যাডিডাসের দাবি, নতুন এই নকশা বলের উড্ডয়নকে আরও স্থিতিশীল করবে এবং খেলোয়াড়দের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে সহায়তা করবে।
প্রযুক্তিনির্ভর এই বলের সেন্সর সচল রাখতে ভেতরের চিপ নিয়মিত চার্জ দিতে হয়। সম্পূর্ণ চার্জে এটি প্রায় ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত কার্যকর থাকে।
আগামী বছরের বিশ্বকাপও হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নেবে এবং অনুষ্ঠিত হবে ১০৪টি ম্যাচ। ১১ জুন মেক্সিকো সিটিতে উদ্বোধনী ম্যাচ দিয়ে পর্দা উঠবে টুর্নামেন্টের। আর ১৯ জুলাই নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত হবে ফাইনাল।
ফুটবলের ঐতিহ্য ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি ট্রাইওন্ডা তাই শুধু একটি ম্যাচ বল নয়; বিশ্বকাপের প্রযুক্তিনির্ভর নতুন অধ্যায়েরও প্রতীক।