‘হামরা মানুষের সম্পত্তিত বাড়ি করি আছি। এক তোলা সম্পত্তি নাই, সোগ তলে গেইছে। তিস্তা টাক রক্ষা করুক।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে এসব কথা বলছিলেন ৫৬ বছর বয়সী বৃদ্ধ ফয়েজ উদ্দিন। তিনি কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বড়দারগাহ মাজার এলাকার বাসিন্দা। ৬০ বছরে এই প্রথম ভাঙনের শিকার হলেন এই বৃদ্ধা।
৫ ছেলে-মেয়ে নিয়ে পাকা বাড়িতে সুখেই দিন কাটছিলো তার। কিন্তু গত রোববার তিস্তার সর্বনাশা ভাঙনে তাদের বসতভিটার ১৪টি ঘর, ৩ একর ফসলি জমি, ৫ শতকের সুপারি বাগান সব নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। নিঃস্ব হয়ে এখন অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়ে কোনমতে দিন কাটছে ফয়েজ উদ্দিনের।
আবেগতাড়িত হয়ে কান্না জড়িত স্বরে বলেন, ‘আমি ৪-৫ দিন থাকি বিভিন্ন দপ্তরে গেছি, আমার বাড়ির সামনে জিও ব্যাগ ফেলার জন্য বলেছি। পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ কোন সরকারি অফিসের লোক আমার কথা শুনলো না। সহায় সম্বল হারিয়ে আমি এখন খোলা আকাশের নিচে।’
সোমবার সরেজমিনে রাজারহাটের চর খিতাবখাঁ, বড়দারগাহ মাজার, সরিষাবাড়ি ও গতিয়াশামে গিয়ে দেখা যায়, তিস্তার পানি রোববার থেকে কমতে শুরু করায় পানির প্রবল বেগে এসব চরের প্রায় চারশত বসতভিটা নদী গর্ভে চলে গেছে। লোকজন যতটুকু পারছেন নিজেদের বসতভিটার মালামাল ও জমির গাছগুলো রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। স্রোতের প্রবল বেগে বাড়িঘর ভাঙনের শিকার হলেও এসব এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে জিও ব্যাগ ফেলা হয়নি বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা।
বড়দারগাহ মাজারের আরেক বাসিন্দা হামিদা খাতুন বলেন, ‘ভাই কি বলবো দুঃখের কথা। আমার ৪টা ঘর আজ সকালে ভেঙে গেছে। ২টা বাচ্চাক নিয়া কই উঠবো, স্বামী অচল, কাজ কাম করতে পারে না। বাড়ির সামনে বালুর বস্তা ফেললেও ভিটেমাটিটা বাঁচানো যেত।’
৮ নং ওর্য়াডের ইউপি সদস্য মো.মামুনুর রশিদ বলেন, ‘গত শনিবার থেকে আমার এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে ২টি গ্রাম আমার বিলীন হয়ে গেছে। পাউবোকে কয়েকবার বলার পরও বড়দারগাহ মাজার এলাকায় জিও ব্যাগ দেয়নি। যার কারণে এখানকার ৩০০টা মতো পরিবার তাদের বসতভিটা হারিয়েছে। এখন ক্রমাগত নদী ভেঙেই চলছে।’
অন্যদিকে, তিস্তার পানি কমে বিপৎসীমার ৯ সে.মি. দিয়ে প্রবাহিত হলেও ব্রহ্মপুত্র, ধরলা আর দুধকুমারের পানি হু হু করে দ্রুতই বৃদ্ধি পাচ্ছে। যার ফলে জেলার চিলমারীর শাখাহাতি, মনতোলা, রমনা, রানীগঞ্জ উলিপুরের বেগমগঞ্জ, গুনাইগাছ, থেতরাই, নাগেশ্বরীর ফান্দের চর,বামনডাঙ্গা, তেলিয়ানির কুঁটি ও জেলা সদরের সাহেবের আলগা, পোড়ার চর, চর ইয়ুথনেট, দই খাওয়ার চরসহ নিম্নাঞ্চলের এলাকাগুলো প্লাবিত হতে শুরু করেছে। তলিয়ে গেছে এসব এলাকার রোপা আমন,মৎস্য খেত ও গো-চারণ ভূমিগুলো। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় চলাচলেও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বানভাসীদের।
সোমবার (২৮ আগষ্ট) কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুপুর ১২টার দেয়া তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি নুন খাওয়া পয়েন্টে ৫ সে.মি. বেড়ে বিপৎসীমার ৫২সে.মি, চিলমারী পয়েন্টে ২সে.মি বেড়ে বিপৎসীমার ৩৯ সে.মি, ধরলা নদীর পানি সেতু পয়েন্টে ১৭ সে.মি বেড়ে বিপৎসীমার ৪৫ সে.মি নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এবং তিস্তার পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ১৬ সে.মি.কমে বিপৎসীমার ৯ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
উলিপুরের বেগমগঞ্জের কৃষক মজিবর রহমান বলেন, ‘সকাল থাকি পানি বাড়ছে। গতকাল হামার ৩ বিঘা জমির আমন ক্ষেতে পানি উঠছে।’
নাগেশ্বরীর বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রনি বলেন, ‘আমার এলাকার প্রায় দুইশত বাড়ির চারপাশে পানি প্রবেশ করেছে। এখানকার নিচু অঞ্চলের মানুষগুলো পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।’
জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক বিপ্লব কুমার জানান, নদ-নদী গুলোর পানি বাড়ার কারণে ২ হাজার ৪০ হেক্টর জমির আমন ধান, ৯৮ হেক্টর সবজি ক্ষেত এবং ১৬ হেক্টর জমির বীজতলা বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড(পাউবো)’র নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘বুড়িরহাটের ১৫০ মিটার বাঁধ ও আরসিসি স্পারের বাকি ৩০ মিটার রক্ষায় রাতদিন কাজ চলমান রয়েছে। আমাদের যথেষ্ঠ জিও ব্যাগ প্রস্তুত করা আছে। বড়দারগাহ এলাকায় ভাঙন প্রতিরোধে আজ কাজ শুরু করা হবে।’
কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল আরীফ জানান, উলিপুর ও রাজারহাটের প্লাবিত এলাকা গুলোতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সেসব বিতরণের কাজ চলমান। পাশাপাশি আমাদের খাদ্য সহায়তা,উদ্ধার নৌকা ও আশ্রয়কেন্দ্রসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।