দুপুরে কক্সবাজারে এই ট্রলার থেকে ১০ জনের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয় – সমকাল
রোববার দুপুরে কক্সবাজারে এই ট্রলার থেকে ১০ জনের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয় – সমকাল
বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার ট্রলারে হত্যার শিকার আরও একজনের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে সোনাদিয়া এলাকায় কঙ্কাল উদ্ধারের পর তা কক্সবাজার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর আগে ১০ জনের লাশ পাওয়া যায়। এ নিয়ে ১১ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হলো। ওই ট্রলারে আরও জেলে ছিলেন কিনা, তা যাচাই করে দেখা হচ্ছে।
কেন, কী কারণে সাগরে ১১ জনকে হত্যা করা হলো– তার পেছনের তথ্যও বেরিয়ে আসছে। কক্সবাজার জেলা পুলিশের পাশাপাশি পুলিশ সদরদপ্তর, পিবিআইসহ একাধিক সংস্থাও এ ঘটনার অনুসন্ধান করছে। লাশ পাওয়ার ১২ দিন আগে চাঞ্চল্যকর ওই হত্যার ঘটনা ঘটে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৭ এপ্রিল সামসুল মাঝির ট্রলারে করে সমুদ্রে যাত্রা শুরু করেছিলেন কয়েকজন। মূলত শামসুল ও নুরুল কবির নামের দুই জলদস্যু অন্যদের প্রলোভন দেখিয়ে সমুদ্রে নিয়ে যান। ৯ এপ্রিল সকালে শামসুলের ট্রলারের লোকজন অন্য একটি ট্রলারে ডাকাতি করে। এরপর আরও একটি ট্রলার টার্গেট করে তারা। তখন ওই ট্রলারের মাঝি লাল পতাকা তুলে আশপাশে থাকা আরও কয়েকটি ট্রলারকে তাদের সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসার সংকেত দেন। এতে আরও ৫টি ট্রলার সাড়া দেয়। এর মধ্যে ৪টি ট্রলারের মাঝিরা জলদস্যুদের ট্রলার ঘেরাও করে। এরপর জলদস্যুরা এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকে। এক পর্যায়ে তাদের কার্তুজ শেষ হয়ে যায়। তখন ৪টি ট্রলারে থাকা জেলেরা জলদস্যুদের পিটিয়ে হত্যা করেন। এরপর তাদের হাত-পা বেঁধে কোল্ডস্টোরেজে ভরে পেরেক দিয়ে আটকে দেন। পরে ট্রলারটির তলা ফুটো করে ডুবিয়ে দেন। জেলেদের ধারণা ছিল, লাশসহ ট্রলারটি ডুবে গেলে আলামত কেউ খুঁজে পাবে না।
জানা গেছে, জলদস্যুদের লাশ গুমের অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছিলেন বাইট্যা কামাল। এই পরিকল্পনায় তাঁকে সহযোগিতা করেন আনোয়ার নামের একজন। জলদস্যুরা সর্বশেষ যে ট্রলারে ডাকাতি করার ছক করে, সেটি ছিল আনোয়ারের। বাইট্যা কামাল সম্পর্কে আনোয়ারের ভাই।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, যে পাঁচ ট্রলার প্রথমে জলদস্যুদের ঘেরাও করেছিল, তার মধ্যে একটি ট্রলারে জলস্যুদের মধ্যে একজনের ভাই ছিলেন। তিনি প্রথমে ঘটনাস্থল থেকে বাড়িতে ফোন করে হত্যার ঘটনাটি স্বজনদের জানান। হত্যার প্রত্যক্ষদর্শী ওই ব্যক্তিকে এখনও খুঁজে পায়নি পুলিশ। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাঁকে সাক্ষী করা হবে।
আরেকটি নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, জলদস্যুদের দলবদ্ধভাবে হত্যা করেছেন জেলেরা। এ ঘটনায় অন্তত ৬০ জন জড়িত। শামসুল ও নুরুল কবিরের ওপর সাধারণ জেলেদের আগে থেকেই ক্ষোভ ছিল। হত্যাকাণ্ডের সপ্তাহখানেক আগেও তারা সাগরে একটি ট্রলারে ডাকাতি করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতেই জলদস্যুরা সাধারণ জেলের বেশ ধারণ করে সাগরে যায়। এরপর কৌশলে জেলেদের জাল, মাছ ও ট্রলার ছিনিয়ে নেয়।
স্থানীয় অন্য একটি সূত্র সমকালকে জানায়, জলদস্যুদের ট্রলার যখন ঘেরাও করা হচ্ছিল, মুহুর্মুহু গুলি করে জলদস্যুরা। একপর্যায়ে আরও কার্তুজ চেয়ে ডাঙায় থাকা জলদস্যুদের সহযোগিতা চায়।
কক্সবাজার জেলার পুলিশ সুপার মাহফুজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, হত্যার ঘটনায় যারা জড়িত থাকুক, সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। কেউ ছাড় পাবে না।
দু’জন রিমান্ডে
কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, গ্রেপ্তার দুই আসামির পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। বুধবার দুপুরে আসামিদের আদালতে তুলে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। পরে কক্সবাজারের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম শ্রীজ্ঞান তঞ্চ্যঙ্গা তাঁদের পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই দুর্জয় বিশ্বাস এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, আদালতের আদেশ পাওয়ার পর বুধবার থেকেই তাঁদের রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ঘটনায় এজাহারভুক্ত অপর দুই আসামিসহ জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশের পাঁচটি দল কাজ করছে।
রিমান্ড মঞ্জুর হওয়া ব্যক্তিরা হলেন- মামলার এজাহারভুক্ত প্রধান আসামি মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী ইউনিয়নের সাইরার ডেইল এলাকার মুহাম্মদ ইলিয়াছের ছেলে বাইট্যা কামাল (৪৫) ও হোয়ানক ইউনিয়নের মোহরাকাটা গ্রামের প্রয়াত মকবুল আহমদের ছেলে নুরুল করিম ওরফে করিম সিকদার মাঝি (৫৫)। এজাহারে উল্লেখ থাকা অপর দুই আসামি হলেন মাতারবাড়ীর আনোয়ার হোসেন ও বাবুল মাঝি।
এর আগে ট্রলারে ১০ মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় চারজনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাতপরিচয় ৫০-৬০ জনকে অভিযুক্ত করে হত্যা মামলা করা হয়। নিহতদের একজন ট্রলার মালিক শামসুল আলমের স্ত্রী রোকেয়া আকতার বাদী হয়ে মঙ্গলবার দুপুরে কক্সবাজার সদর থানায় মামলাটি করেন।