জাতীয় / ধর্ম । সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে।
প্রকাশের তারিখ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬
মাদ্রাসায় শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন, বলাৎকার ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের বিরুদ্ধে আলেম সমাজের একটি বড় অংশের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। এসব অপরাধের বিরুদ্ধে ধর্মীয় নেতাদের প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা দাবি করা এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে আসিফ নজরুল এসব কথা বলেন। শনিবার প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।
নিজের পোস্টে আসিফ নজরুল বলেন, বাংলাদেশের আলেম সমাজে অনেক শ্রদ্ধেয় ও সম্মানিত মানুষ রয়েছেন। ধর্মীয় অনুষ্ঠান, নামাজ ও হজের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি তাঁদের কাউকে কাউকে কাছ থেকে দেখেছেন বলেও উল্লেখ করেন। এ ছাড়া মাওলানা আহমাদুল্লাহর মতো কিছু আলেমের মানবিক কর্মকাণ্ড তাঁকে মুগ্ধ করেছে বলে জানান তিনি।
তবে আলেম সমাজের একটি অংশের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সাবেক এই আইন উপদেষ্টা বলেন, বৃহত্তর আলেম সমাজের মধ্যে মাদ্রাসার শিক্ষকদের মতো বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন।
আসিফ নজরুলের বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের সংখ্যা হয়তো তুলনামূলকভাবে কম, কিন্তু বিষয়টিকে একেবারে নগণ্য বলে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত এসব অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবার আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।
পোস্টে আসিফ নজরুলের প্রধান সমালোচনার বিষয় ছিল, বিভিন্ন সামাজিক ও ব্যক্তিগত বিষয়ে ধর্মীয় বিধান এবং ফতোয়া দেওয়ার ক্ষেত্রে আলেম সমাজের অনেকে সক্রিয় থাকলেও নিজেদের গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের বিরুদ্ধে তাঁদের অনেককে দৃশ্যমানভাবে সোচ্চার হতে দেখা যায় না।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, খাবার, পোশাক, বিনোদন ও বাক্স্বাধীনতার মতো বিষয়ে যাঁরা বক্তব্য দেন, তাঁদের মধ্যে অনেকে মাদ্রাসায় শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে পিছিয়ে থাকেন কেন।
আসিফ নজরুল আরও উল্লেখ করেন, কিছু ঘটনায় বিভিন্ন বিষয়ে মানুষকে সংঘবদ্ধ হতে দেখা যায় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। অথচ শিশুদের নিরাপত্তা ও যৌন নির্যাতনের মতো গুরুতর বিষয়ে ধর্মীয় নেতৃত্বের আরও জোরালো অবস্থান থাকা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, ধর্মীয় পরিচয় বা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সদস্য হওয়ার কারণে অপরাধের অভিযোগকে আড়াল করা কিংবা অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করার কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়।
আসিফ নজরুল তাঁর পোস্টে ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো অপরাধ ইসলামের দৃষ্টিতেও গুরুতর পাপ। এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুশাসনের আলোকে আলেমদের স্পষ্ট বক্তব্য দেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের আলেম সমাজ মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে সমাজে সম্মানজনক অবস্থান ধরে রেখেছে। তাই এই আস্থা অটুট রাখতে হলে সমাজের ভেতরে সংঘটিত গুরুতর অন্যায় ও অপরাধের বিরুদ্ধে তাঁদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা জরুরি।
সাবেক আইন উপদেষ্টার মতে, এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হয়ে কেউ যদি অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রতি সহানুভূতি দেখান, তাহলে সামগ্রিকভাবে আলেম সমাজের প্রতি মানুষের আস্থা ও শ্রদ্ধা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর নেতিবাচক প্রভাব বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসাগুলোর ওপরও পড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাঁকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যায় না। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন।
পোস্টের শেষাংশে আসিফ নজরুল আশা প্রকাশ করেন, আলেম সমাজের নেতৃত্ব এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর ভূমিকা নেবে। মাদ্রাসায় শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে ধর্মীয় নেতারা প্রকাশ্যে কথা বলবেন এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাবেন—এমন প্রত্যাশার কথাও জানান তিনি।
তাঁর মতে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা করার অন্যতম উপায় হলো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারও বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি উপেক্ষা না করা। বরং অভিযোগের যথাযথ তদন্ত নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা দেওয়া এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তোলা প্রয়োজন।
শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর ভাবমূর্তির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়; এটি শিশুদের নিরাপত্তা, অধিকার ও ন্যায়বিচারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ—সবারই শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব রয়েছে।
এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী শিশুর পরিচয় ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা, অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা এবং প্রভাব বা পরিচয়ের কারণে কাউকে আইনের আওতার বাইরে রাখার সুযোগ না দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে যাচাই ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
আসিফ নজরুলের বক্তব্যে মূলত আলেম সমাজের নৈতিক দায়িত্ব, ধর্মীয় নেতৃত্বের জবাবদিহি এবং শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত গুরুতর অপরাধের বিষয়ে প্রকাশ্য অবস্থান নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। তাঁর আহ্বান, ধর্মীয় নেতারা যেন এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে আরও স্পষ্টভাবে কথা বলেন এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
সূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, ২৪ অক্টোবর ২০২৬। প্রতিবেদনটি আসিফ নজরুলের ২৩ অক্টোবর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টের ভিত্তিতে প্রকাশিত।