ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামোকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে নির্মাণকাজ চললেও বিশেষ বাস চালু না হওয়া এবং যাত্রীদের ভোগান্তি না কমায় প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটিতে এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিআরটি ব্যবস্থার জন্য নির্মিত স্টেশন ও লেন বিভাজক সরিয়ে সড়কটিকে তিন থেকে ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তর করা হবে। পাশাপাশি দুটি দুই লেনের উড়ালসড়ক চার লেনে সম্প্রসারণের প্রস্তাব রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গত রোববার অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়। পরদিন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেয়। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে এবং ১৫ দিনের মধ্যে অগ্রগতি জানাতে বলা হয়েছে।
২০১২ সালে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল সড়কের মাঝখানে পৃথক লেনে বিশেষ বাস চালিয়ে দ্রুত যাত্রী পরিবহন করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্পটি ২০১৬ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল এবং পরের বছর থেকে বাস চলাচল শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। প্রকল্পের ব্যয়ও কয়েক দফায় বেড়েছে। শুরুতে প্রায় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হলেও তিন দফা সংশোধনের পর তা ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। পরবর্তী সংশোধনী প্রস্তাবে ব্যয় ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল। তবে সেই প্রস্তাব অনুমোদন পায়নি।
বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত ব্যস্ত মহাসড়কে নির্মাণকাজ চলায় দীর্ঘদিন ধরে যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। সড়কের বিভিন্ন অংশে উড়ালপথ, অসমাপ্ত লেন ও বিভাজক থাকায় যানবাহন চলাচলে জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় নির্মিত ১৫টি স্টেশনের কাজও পুরোপুরি শেষ হয়নি। কয়েকটি পদচারী-সেতুতে লিফট ও চলন্ত সিঁড়ি থাকলেও অনেক স্থাপনা ব্যবহার উপযোগী হয়নি।
এ ছাড়া প্রকল্পের নকশা ও বাস্তবায়নে একাধিক সমস্যা উঠে এসেছে। পর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা, বিভিন্ন সেবা সংস্থার লাইন স্থানান্তর এবং নির্মাণকাজের সময় যানবাহন চলাচল সচল রাখার পরিকল্পনায় ঘাটতি ছিল বলে বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে। নির্মাণকাজের সময় বিভিন্ন দুর্ঘটনায় সাতজনের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞ দল প্রকল্পটির কারিগরি দিক পর্যালোচনা করে এটিকে বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামো উন্নত মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশ করেছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনা ও নকশার ত্রুটি, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং জবাবদিহির ঘাটতি প্রকল্পটির ব্যর্থতার পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক মনে করেন, প্রকল্পটি বাতিলের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ভোগান্তি সহ্য করা গাজীপুরের বাসিন্দাদের জন্য বিকল্প গণপরিবহন নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে গাজীপুর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত কমিউটার ট্রেন চালুর বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
অন্যদিকে, ‘গাজীপুর ঐতিহ্য ও উন্নয়ন’ নামের একটি সংগঠন প্রকল্পটি সম্পন্ন করে বিশেষ বাস চালুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি মো. শামসুল হক বলেছেন, কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত তাঁরা মেনে নেবেন না। এ বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে চিঠি দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
বিআরটি প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণ, উড়ালসড়ক সম্প্রসারণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস করতে হবে। বিশেষ বাস পরিচালনার জন্য গঠিত ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি বন্ধ করে এর দায়িত্ব সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) আওতায় নেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।
দীর্ঘদিনের ভোগান্তির পর মহাসড়কটি কার্যকরভাবে ব্যবহারযোগ্য করা এখন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের পর প্রকল্পটি কেন প্রত্যাশিত সেবা দিতে পারেনি, সে বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতের উন্নয়ন প্রকল্পে একই ধরনের ভুল এড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: প্রথম আলো।