চলমান আন্তর্জাতিক সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বড় ধরনের খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে এশিয়া সোসাইটি আয়োজিত এক উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ আশঙ্কার কথা জানান। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশন শেষে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে জয়শঙ্কর বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাতের প্রভাব বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে তীব্র চাপ তৈরি করছে।
জয়শঙ্করের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান সংকটের অন্যতম বড় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে জ্বালানি, সার ও খাদ্যশস্যের সরবরাহব্যবস্থায়। আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা ইতিমধ্যে নানা বাধার মুখে রয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
তিনি বলেন, তেলের সরবরাহ নিরাপদ রাখা এবং তেলকে ঘিরে আন্তর্জাতিক রাজনীতি—এই দুই বিষয় একে অপরকে প্রভাবিত করছে। রাজনৈতিক স্বার্থে জ্বালানি নিয়ে কোনো পক্ষ ‘রাজনৈতিক খেলা’ খেললে বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, বিশ্বের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য রপ্তানিকারক দেশ বর্তমানে তাদের পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠাতে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। বিশেষ করে কৃষ্ণসাগর দিয়ে সমুদ্রপথে খাদ্যশস্য রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
একই সঙ্গে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সার উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ায় হওয়ায় সেখানে সংঘাত ও অস্থিরতার প্রভাব সার সরবরাহের ওপর পড়তে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
খাদ্যনিরাপত্তার ওপর যুদ্ধ ও সরবরাহব্যবস্থার সংকটের পাশাপাশি জলবায়ুগত পরিবর্তনের প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জয়শঙ্কর। তাঁর বক্তব্যে ‘সুপার এল নিনো’র মতো জলবায়ুগত পরিস্থিতির কারণে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে বলে উল্লেখ করা হয়।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, আগামী মাসগুলোতে একসঙ্গে জ্বালানি, খাদ্য ও সারের সংকট দেখা দিতে পারে। সংঘাতের কারণে বিনিয়োগের অর্থ উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে চলে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হলে এসব দেশের জন্য অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে।
জ্বালানি সংকটের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেন জয়শঙ্কর। তাঁর মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের পর প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে এর প্রত্যক্ষ প্রভাব হিসেবে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা গেছে। ইরান ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বর্তমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে দক্ষিণ এশিয়াতেও এর প্রভাব আরও বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোকে নিজেদের সিদ্ধান্তের প্রভাব উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর কীভাবে পড়ছে, তা বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর মতে, দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মৌলিক চাহিদার বিষয়টি আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
জয়শঙ্কর বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের নিজস্ব কৌশল ও নীতিতে পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হতে পারে। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে স্বনির্ভরতা বাড়ানো এবং সরবরাহব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।