অসহায়, আশ্রয়হীন ও অবহেলিত প্রবীণদের নিরাপদ আবাসনের জন্য দেশের আটটি জেলায় নির্মাণ করা হয়েছে আটটি ‘শান্তিনিবাস’। প্রতিটি নিবাসে ২৫ জন করে মোট ২০০ প্রবীণের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে প্রায় তিন বছর আগে নির্মাণ ও উদ্বোধন হলেও এখন পর্যন্ত কোনো শান্তিনিবাসেই একজন প্রবীণও বসবাস শুরু করতে পারেননি।
২০২০ সালের জুলাইয়ে নেওয়া প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৭৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয় সংশোধন করে প্রায় ৮২ কোটি টাকা করা হয়। ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর আটটি শান্তিনিবাসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৬০ বছরের বেশি বয়সী পরিত্যক্ত, দাবিদারহীন, দুর্দশাগ্রস্ত ও অবহেলিত প্রবীণদের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করাই ছিল প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে প্রবীণদের পরিচর্যা, নিরাপত্তা ও জীবনমান উন্নয়নের পরিকল্পনাও ছিল।

তালাবদ্ধ কক্ষে অবহেলায় পড়ে আছে আসবাব। তাতে জমছে ধুলা। ২৪ সেপ্টেম্বর খুলনা নগরের মহেশ্বরপাশায় নির্মিত শান্তিনিবাসে
কিন্তু ভবন নির্মাণের পর সেগুলো দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকায় বিভিন্ন স্থানে ধুলা জমেছে, আসবাব ও সরঞ্জাম নষ্ট হচ্ছে এবং কোথাও কোথাও দেয়াল ও সিঁড়িতে শেওলা জমেছে। খুলনায় রেলিংয়ে মরিচা ধরেছে, ময়মনসিংহে বৃষ্টির পানি ঢুকে আসবাব নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। লালমনিরহাটে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কথাও জানা গেছে।

ব্যবহারের আগেই মরিচা পড়েছে রেলিংয়ে। বরিশাল শহরের সাগরদী সরকারি শিশু পরিবার (বালক) প্রাঙ্গণে অবস্থিত শান্তিনিবাসে
আটটি শান্তিনিবাসের মধ্যে গোপালগঞ্জ, লালমনিরহাট, সুনামগঞ্জ ও নোয়াখালীর নিবাসগুলো নারীদের জন্য এবং ময়মনসিংহ, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালের নিবাসগুলো পুরুষদের জন্য নির্ধারিত। প্রতিটি ভবনে শয্যাকক্ষ, স্বাস্থ্যসেবা কর্নার, লিফট, বিনোদন ও শরীরচর্চার ব্যবস্থা, প্রার্থনাকক্ষ, প্রশিক্ষণ ও কফি কর্নারসহ বিভিন্ন সুবিধা রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, শান্তিনিবাস পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না হওয়াই প্রধান কারণ। পাশাপাশি নিবাসগুলো চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় বাজেটও অনুমোদিত হয়নি। ফলে ভবন প্রস্তুত থাকলেও কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহ্বুব জানিয়েছেন, জনবল না থাকায় এতদিন শান্তিনিবাসগুলো চালু করা যায়নি। গত মাসে আটটি শান্তিনিবাসের জন্য জনবল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং অক্টোবরের মধ্যে এগুলো চালু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
এদিকে, ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখের বেশি, যা মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। ২০১১ সালের জনশুমারিতে এই হার ছিল ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
প্রকল্পটির পরিকল্পনা ছিল, পরীক্ষামূলকভাবে নির্মিত আটটি শান্তিনিবাসের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে দেশের অন্যান্য জেলাতেও প্রবীণদের জন্য এমন আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। কিন্তু উদ্বোধনের প্রায় তিন বছর পরও আটটি ভবনের কোনোটিতে প্রবীণদের আবাসন নিশ্চিত না হওয়ায় প্রকল্পটির বাস্তব ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।