সংবাদ পোস্ট | অপরাধ
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি:
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার কুঞ্জছায়া আবাসিক এলাকায় ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত আবু ইউসুফ ওরফে জীবন (২৭) মারা গেছেন। মঙ্গলবার রাতে হামলার শিকার হওয়ার পর তাঁর ডান পায়ের হাঁটুর নিচ থেকে গোড়ালি পর্যন্ত গুরুতর জখম হয়। চিকিৎসকেরা তাঁর ডান পা কেটে ফেললেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
নিহত আবু ইউসুফ একটি আইসক্রিম কারখানায় কাজ করতেন। তাঁর পরিবারের অভিযোগ, রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।
ছেলের মৃত্যুর পর আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বাবা গোলাম নবী অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক পক্ষ পরিবর্তনের কারণেই তাঁর ছেলেকে টার্গেট করা হয়েছিল।
প্রথম আলোকে তিনি বলেন, তাঁর ছেলের পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়েছিল। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে শেষ পর্যন্ত মৃত্যু হয় তাঁর। চিকিৎসকেরা ডান পা কেটে ফেলেও ছেলেকে বাঁচাতে পারেননি।
গোলাম নবীর অভিযোগ, এক যুবদল নেতার পক্ষ ছেড়ে অন্য রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিরোধ থেকেই তাঁর ছেলেকে প্রাণ দিতে হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। যুবদল নেতা জিল্লুর রহমান হামলায় নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে কুঞ্জছায়া আবাসিক এলাকার ২ নম্বর সড়কে আবু ইউসুফসহ চার থেকে পাঁচজন বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। এ সময় ছাত্রদল ও যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত কয়েকজন সেখানে যান।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রের বরাতে জানা যায়, ইকরাম বাবু, আরমান, মেহেদী ও নাবিদসহ ১৩ থেকে ১৪ জনের একটি দল সেখানে উপস্থিত হয়। তাঁদের কয়েকজনের মাথায় হেলমেট ছিল। তাঁদের হাতে ধারালো অস্ত্র ও পিস্তল ছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, হামলাকারীরা প্রথমে আবু ইউসুফকে মারধর করেন। পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাঁর ডান পায়ের হাঁটুর নিচ থেকে গোড়ালি পর্যন্ত আঘাত করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে ফেলে রেখে হামলাকারীরা চলে যান।
হামলার পর আহত আবু ইউসুফের ধারণ করা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওতে তিনি ইকরাম বাবু ও আরমানের নাম উল্লেখ করে তাঁদের বিরুদ্ধে ছুরিকাঘাত ও গুলি করার অভিযোগ করেন।
ঘটনার পর বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আলোচনা তৈরি হয়। তবে ভিডিওতে করা অভিযোগের পাশাপাশি তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও হামলায় কারা জড়িত, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
পুলিশের সূত্র অনুযায়ী, আবু ইউসুফ গত দুই বছর চট্টগ্রাম নগর যুবদলের প্রচার সম্পাদক জিল্লুর রহমান ওরফে জুয়েলের অনুসারী হিসেবে দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন। সম্প্রতি তিনি যুবদলের রাজনীতি ছেড়ে নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য নুরুজ্জামান ওরফে শিমুলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন বলে জানা গেছে।
এরপর জিল্লুর রহমানের ভাগনে মেহেদী ও তাঁর অনুসারীদের সঙ্গে আবু ইউসুফের বিরোধ তৈরি হয়। পরিবারের অভিযোগ, সেই বিরোধের জের ধরেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। জিল্লুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আবু ইউসুফ যুবদলের কেউ ছিলেন না; তিনি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর মোবারক আলীর সঙ্গে থাকতেন। জিল্লুর রহমান আরও দাবি করেন, আবু ইউসুফ তাঁর ভাগনের বন্ধু হওয়ায় তিনি তাঁকে সহায়তা করতেন। তবে হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, তাঁকে তিনি মারেননি; নিজেদের মধ্যে মারামারি হয়েছে।
ঘটনার পর নিহত আবু ইউসুফের মা কামরুন নাহার ১৫ জনকে আসামি করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় যুবদল নেতা জিল্লুর রহমানকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।
আবু ইউসুফের মৃত্যুর পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইখতিয়ার উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ছুরিকাঘাতে আহত আবু ইউসুফ বৃহস্পতিবার দুপুরে হাসপাতালে মারা গেছেন। এ ঘটনায় সাহেদ নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
একজন তরুণের এমন মৃত্যু তাঁর পরিবারকে গভীর শোকের মধ্যে ফেলেছে। পরিবারের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক বিরোধকে হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ, হামলায় কারা সরাসরি অংশ নিয়েছেন এবং কার কী ভূমিকা ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
পুলিশ জানিয়েছে, মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তদন্তের অগ্রগতি ও আদালতের কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে প্রকৃত তথ্য সামনে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সূত্র: প্রথম আলো