রোববার (১১ অক্টোবর) প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টার-এর এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের পদ্মার তীরবর্তী চরাঞ্চলে ভাঙনের কারণে এই মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ইউনিয়ন পরিষদের তথ্যের ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের আগস্ট থেকে আলম-খানকান্দি গ্রামে নতুন করে ৩০৩টি পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। নদী ক্রমাগত বসতভিটা ও কৃষিজমি গ্রাস করায় অনেক পরিবারকে নিজেদের ঘর ভেঙে মালামাল সরিয়ে নিতে হচ্ছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদীভাঙনের আশঙ্কায় বাসিন্দারা ঘরবাড়ি খুলে সরিয়ে নিচ্ছেন। ইতিমধ্যে যারা ঘর হারিয়েছেন, তাদের কেউ সড়কের পাশে অস্থায়ী ঘরে বসবাস করছেন, আবার কেউ ভাড়া জমিতে টিনের ছাউনি দিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন।
পরিবারগুলোর কাছে ঘর হারানো শুধু আবাসনের সংকট নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে জীবিকার অবলম্বন, কৃষিজমি এবং দীর্ঘদিনের বসতভিটাকে ঘিরে গড়ে ওঠা সামাজিক সম্পর্ক।
নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে রয়েছেন ৬০ বছর বয়সী দুলুনা বেগম। মেয়ের পরিবারের দুর্দশার খবর পেয়ে তিনি মুন্সিগঞ্জ থেকে জাজিরায় এসেছেন। তাঁর মেয়ের পরিবারও নদীভাঙনের কারণে বসতভিটা হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে তাঁদের পরিবারের প্রায় ৯ বিঘা কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। জমি হারানোর পর পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
একই এলাকার ৩৮ বছর বয়সী মো. শহিদ ফকিরও নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়েছেন। একসময় তাঁর ২৫ বিঘা জমি ছিল। সেখানে তিনি বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ করতেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের ভাঙনে জমি হারানোর পাশাপাশি তাঁর জীবিকার পথও সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন খানের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর আহাম্মদ মাঝিকান্দি, মঙ্গল মাঝিকান্দি, আলিমউদ্দিন বেপারীকান্দি ও মাঝিকান্দি গ্রামের প্রায় ১ হাজার ৫০০ পরিবার নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত হয়েছিল।
পদ্মা সেতুর কাছের চরাঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। একসময় যেখানে বসতি, কৃষিজমি ও যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, সেখানে এখন নদীর প্রবল স্রোতে জমি বিলীন হচ্ছে।
ভিটেমাটি হারানো অনেক পরিবার শরীয়তপুরের অন্য এলাকায় কিংবা মুন্সিগঞ্জে চলে গেছে। কেউ ভাড়া বাসায় থাকছে, কেউ আবার অন্যের জমি ইজারা নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টা করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পদ্মা সেতুর দক্ষিণ প্রান্তের কাছাকাছি একটি নির্মাণ এলাকায় অন্তত ২৫০টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। এসব পরিবারের অনেকের পক্ষে নতুন করে জমি ভাড়া নেওয়া বা বাড়ি নির্মাণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
তবে সেখানে বসবাস নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে জায়গা ছেড়ে দেওয়ার নোটিশ দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নদীভাঙনের ফলে শুধু ঘরবাড়ি নয়, বিদ্যুৎ সরবরাহের অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছয়টি গ্রামের প্রায় ১ হাজার ২০০ গ্রাহকের জন্য স্থাপিত বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের বড় একটি অংশ সরিয়ে নিতে হয়েছে। নদীর গ্রাস থেকে অবকাঠামো রক্ষায় গত কয়েক মাসে আলম-খানকান্দি এলাকায় আরও সঞ্চালন লাইন অপসারণ করা হয়েছে।
শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মিল্টন হোসেন জানিয়েছেন, নদীভাঙনের বিষয়টি তাঁদের জানা আছে এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নদীভাঙন মোকাবিলায় মূল ভূখণ্ড রক্ষা করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ফলে চরাঞ্চলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া অনেক সময় সম্ভব হয় না। তিনি এলাকাটি পরিদর্শন করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, ভাঙন রোধে কার্যকর পদক্ষেপের জন্য তাঁরা কয়েক বছর ধরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে আসছেন। কিন্তু স্থায়ী সমাধান না পাওয়ায় একের পর এক পরিবার বসতভিটা হারাচ্ছে।
পদ্মার ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য, জীবিকা ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। দীর্ঘদিনের বসতভিটা হারিয়ে অনেক পরিবার নতুন এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাসের সামর্থ্য হারিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ কমাতে নদীভাঙনপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা, প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ বসতি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষায় দ্রুত সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
পদ্মার ভাঙনে প্রতিদিনই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে নদীতীরের মানুষের জীবন। যথাসময়ে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে আরও পরিবারকে ঘরবাড়ি ও জীবিকার শেষ অবলম্বন হারাতে হতে পারে।
সূত্র: The Daily Star, ১১ অক্টোবর ২০২৬।
সংবাদ পোস্ট | মানুষের কথা, মানুষের পাশে।