নরসিংদী | সংবাদ পোস্ট
নরসিংদীতে মা-বাবার আশ্রয়বঞ্চিত সাত বছর বয়সী বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু সোহানার পাশে দাঁড়িয়েছে জেলা প্রশাসন। শিশুটির চিকিৎসা, নিরাপত্তা, আইনগত পরিচয় ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শিশুটির মা-বাবার সন্ধান এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া সদর উপজেলার বানিয়াছল এলাকায় গিয়ে সোহানার খোঁজখবর নেন। শিশুটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে অবগত হওয়ার পাশাপাশি তার চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
জন্ম থেকেই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন, মা-বাবার আশ্রয় নেই
সোহানা জন্মগতভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন। তার বয়স মাত্র সাত বছর। শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে সে ঠিকমতো হাঁটাচলা করতে পারে না। এই বয়সে পরিবারের স্নেহ, নিরাপত্তা ও যত্নে বেড়ে ওঠার কথা থাকলেও তার জীবন কাটছে অনিশ্চয়তার মধ্যে।
অভিযোগ রয়েছে, সোহানার মা-বাবা তাকে রেখে চলে গেছেন। বর্তমানে তাঁরা কোথায় আছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে শিশুটির পারিবারিক পরিচয়, দায়িত্ব গ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ বছর ধরে শিশুটিকে নিজের কাছে রেখে লালন-পালন করছেন আম্বিয়া বেগম নামে এক নারী। শিশুটির বর্তমান পরিস্থিতি সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে আলোচনা তৈরি হয় এবং জেলা প্রশাসন তার পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেয়।
নিজেই অসহায়, তবু সোহানার আশ্রয় আম্বিয়া বেগম
সোহানার জীবনের সবচেয়ে মানবিক দিকগুলোর একটি হলো আম্বিয়া বেগমের নিঃস্বার্থ ভূমিকা। শিশুটির সঙ্গে তাঁর কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই। তবু দীর্ঘদিন ধরে নিজের কাছে রেখে তাকে আগলে রেখেছেন তিনি।
আম্বিয়া বেগম নিজেও বয়স্ক ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল। নিজের খাবার জোগাড় করতেই তাঁকে ভিক্ষা করতে হয়। সেই সামান্য অর্থ থেকে শিশুটির খাবার ও পরিচর্যার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেন তিনি।
নিজের জীবনযাপনই যেখানে কঠিন, সেখানে আরেকটি শিশুর দায়িত্ব পালন করা তাঁর জন্য সহজ নয়। তারপরও সোহানাকে পরিত্যাগ না করে নিজের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে যত্ন নিয়ে আসছেন তিনি।
আম্বিয়া বেগমের এই মানবিক ভূমিকার জন্য জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। রক্তের সম্পর্কের বাইরে গিয়েও একজন অসহায় শিশুর প্রতি তাঁর মমতা ও দায়িত্ববোধ মানবিকতার গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
সোহানার চিকিৎসা ও জন্মনিবন্ধনের উদ্যোগ
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সোহানাকে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য নরসিংদী সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি তার জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন করা, বিশেষ চাহিদার ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় তাকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো শিশুটির প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং তাকে সরকারি সেবা ও সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার পথ তৈরি করা।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন একটি শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য নিয়মিত চিকিৎসা, উপযুক্ত পরিচর্যা, পুষ্টিকর খাবার ও নিরাপদ পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সোহানার ক্ষেত্রেও তার শারীরিক অবস্থা ও বিশেষ প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
মা-বাবার সন্ধানে প্রশাসন, প্রয়োজনে সরকারি আশ্রয়
সোহানার মা-বাবাকে খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। তাঁদের সন্ধান পাওয়া গেলে শিশুটিকে ফেলে যাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ রয়েছে।
তবে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। শিশুটির নিরাপত্তা ও সর্বোত্তম স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
জেলা প্রশাসন আরও জানিয়েছে, প্রয়োজনে সোহানাকে সরকারি শিশু পরিবারে নিরাপদ আশ্রয়ে রাখার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। অর্থাৎ, তার পারিবারিক পরিস্থিতি ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে উপযুক্ত আশ্রয় নিশ্চিত করার উদ্যোগ রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে শুধু সাময়িকভাবে নিরাপদ স্থানে রাখা নয়, বরং শিশুটির নিয়মিত চিকিৎসা, পরিচর্যা, শিক্ষা এবং বয়স অনুযায়ী বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সোহানার ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় প্রয়োজন ধারাবাহিক উদ্যোগ
সোহানার পাশে জেলা প্রশাসনের দাঁড়ানো তার জন্য আশার বার্তা। তবে শিশুটির ভবিষ্যৎ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন ও নিয়মিত তদারকি করা প্রয়োজন।
জন্মনিবন্ধন, চিকিৎসা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তি এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা কার্যকর হলে সোহানা সরকারি সেবার সুযোগ পেতে পারে। পাশাপাশি তার পরিচর্যাকারী আম্বিয়া বেগমের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কারণ, নিজের মৌলিক চাহিদা পূরণে সংগ্রাম করা একজন বয়স্ক নারীর পক্ষে একা একটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব পালন করা কঠিন। শিশুটির পাশাপাশি তাঁর প্রয়োজন ও সীমাবদ্ধতার প্রতিও সহমর্মী হওয়া জরুরি।
একটি শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব
সোহানার ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি শিশুর নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা, পরিচর্যা ও মর্যাদার সঙ্গে বেড়ে ওঠার অধিকার রয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের ক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ।
একদিকে আম্বিয়া বেগমের নিঃস্বার্থ মমতা, অন্যদিকে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ—দুটি ঘটনাই মানবিক দায়িত্ববোধের গুরুত্ব তুলে ধরে।
এখন প্রত্যাশা, সোহানার চিকিৎসা ও সামাজিক সুরক্ষার উদ্যোগগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে, তার মা-বাবার সন্ধান পাওয়া যাবে এবং শিশুটির জন্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সূত্র: ২৪–২৫ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও জেলা প্রশাসনের বিষয়ে প্রকাশিত তথ্য।