ইরানের বন্দরে অবরোধ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র
Saimum Sayem
-
প্রকাশ কাল:
মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬
-
৩১
জন দেখেছেন
রয়টার্স ও এএফপি
ইরানের সব বন্দর, হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের সমুদ্রপথের বিস্তৃত এলাকায় নৌ অবরোধ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল সোমবার ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় (বাংলাদেশ সময় সোমবার রাত ৮টা) এ অবরোধ কার্যকর হয়েছে। ইরানের বন্দরগুলোয় মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ কার্যকর হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বিষয়ে পোস্ট করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ইরানের কোনো জাহাজ পারস্য উপসাগরে কার্যকর হওয়া অবরোধের আওতাধীন এলাকার কাছাকাছি আসার চেষ্টা করলে সেগুলোকে তৎক্ষণাৎ ধ্বংস করে দেওয়া হবে। ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরস (আইআরজিসি) যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তারা বলেছে, আন্তর্জাতিক জলসীমায় এ ধরনের অবরোধ অবৈধ ও জলদস্যুতার শামিল।
পাকিস্তানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২১ ঘণ্টার আলোচনা ব্যর্থ হয়। এর কয়েক ঘণ্টা পর গত রোববার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিসহ ইরানের সব বন্দর অবরোধের হুমকি দিয়েছিলেন। গতকাল মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) তা কার্যকর করে।
যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের ঘোষণা দেওয়ার পরপরই আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজার আবার অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে শুরু করে। প্রতি ব্যারেল জ্বালানির দাম গতকাল আবার ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা গত বুধবার অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর কিছুটা কমেছিল। দ্য ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির কর্মকর্তা ডানা স্ট্রোল বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘ট্রাম্প একটি দ্রুত সমাধান চান।…বাস্তবতা হলো, এই মিশন একা বাস্তবায়ন করা কঠিন। দীর্ঘ মেয়াদে এটি ধরে রাখা সম্ভবত খুব কঠিন হবে।’
কোন দেশ কী বলছ..
অবরোধ কার্যকর করার ঘণ্টাখানেক আগে সেন্টকম এক বার্তায় জানায়, ‘অবরোধের আওতাভুক্ত ওমান উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির পূর্বে আরব সাগরে চলাচলকারী সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।…অনুমতি ছাড়া অবরোধের আওতায় থাকা এলাকায় জাহাজ প্রবেশ করলে বা সেখান থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে তা পথিমধ্যে আটক, পথ পরিবর্তন কিংবা জব্দ করা হতে পারে। সংশ্লিষ্ট জাহাজটি কোন দেশের পতাকাবাহী, সেটি এখানে বিবেচনা করা হবে না।’
হোয়াইট হাউসে গতকাল সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অবরোধের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, মার্কিন অবরোধের মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বকে ‘ব্লাকমেল’ ও ‘চাঁদাবাজি’ করা থেকে ইরানকে বিরত রাখা।
‘শক্ত জবাব দিতে দ্বিধা করবে না ইরান’
মার্কিন অবরোধ কার্যকর করার ঘোষণা আসার পর ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বিবৃতিতে জানায়, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তায় বিদেশি শক্তির সামরিক হস্তক্ষেপ সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে। হরমুজ প্রণালি বা অন্য কোথাও যেকোনো আগ্রাসনকারীর বিরুদ্ধে শক্ত জবাব দিতে ইরান একমুহূর্তও দ্বিধা করবে না।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই মার্কিন অবরোধের সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘অবরোধ বিশ্ব অর্থনীতির বিরুদ্ধে একটি প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে কোনো অবৈধ যুদ্ধে জেতা কি সম্ভব?’
এর আগে ইরানের একজন সামরিক মুখপাত্র জানান, আন্তর্জাতিক জলসীমায় নৌযানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের বিধিনিষেধ হবে অবৈধ ও জলদস্যুতার শামিল।…ইরানের বন্দর হুমকির মুখে পড়লে পারস্য উপসাগর বা ওমান উপসাগরের কোনো বন্দরই নিরাপদ থাকবে নআইআরজিসি আগেই জানিয়েছিল, অবরোধের উদ্দেশ্যে কোনো সামরিক নৌযান হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি আসার চেষ্টা করলে তা যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ১৫টি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন
হরমুজে কীভাবে অবরোধ কার্যকর করা হচ্ছে, কতগুলো যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হচ্ছে, যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হবে কি না, উপসাগরীয় মিত্রদেশ এ প্রচেষ্টায় সহায়তা করবে কি না, তা জানতে সেন্টকমের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল রয়টার্স। কিন্তু তারা তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যাপ্ত যুদ্ধজাহাজ থাকলে মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজে এমন একটি অবরোধ তৈরি করতে পারে, যা অনেক বাণিজ্যিক নৌযানকে ইরানি তেল পরিবহনে বাধা দিতে পারবে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, অবরোধ সফল করতে যুক্তরাষ্ট্রের ১৫টির বেশি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল বিবিসি জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন গত শনিবার ইরান উপকূল থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার (১২৪ মাইল) দূরে অবস্থান করছিল।
তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মুহাম্মদ ইসলামি আল-জাজিরাকে বলেন, মার্কিন বাহিনী কি এই বিশাল জলপথে ট্যাংকার ও সুপারট্যাংকারগুলোকে থামাতে সক্ষম হবে?…এটা কঠিন অভিযান হবে।
আর মার্কিন নৌ অভিযানের সাবেক প্রধান অবসরপ্রাপ্ত অ্যাডমিরাল গ্যারি রাফহেড বলেন, এই পরিস্থিতিতে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের জাহাজে হামলা চালাতে পারে। অথবা মার্কিন বাহিনীর ঘাঁটি থাকা উপসাগরীয় দেশগুলোর অবকাঠামোতে হামলা চালাতে পারে।
কোন দেশ কী বলছে
অবরোধ কার্যকর হওয়ার আগে ট্রাম্প রোববার ফক্স নিউজকে বলেন, ‘আমরা মনে করি, বহু দেশ এ কাজে (হরমুজ অবরোধে) আমাদের সহায়তা করতে যাচ্ছে।’ কিন্তু গতকাল রাত ১২টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ইসরায়েল ছাড়া কোনো দেশ এতে সম্মতি জানায়নি।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার গতকাল বিবিসি রেডিও ৫-কে বলেন, ‘আমার দেশ এ অবরোধকে সমর্থন করবে না। প্রণালিটি সচল করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা কীভাবে করা যায়, আমরা তা নিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’ এর আগে গতকাল ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বলেন, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য একটি ‘শান্তিপূর্ণ বহুজাতিক মিশন’ নিয়ে কাজ করবে। স্পেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্গারিটা রোবলস বলেন, ট্রাম্পের এ অবরোধের কোনো অর্থ নেই। ট্রাম্পের অবরোধের এ আদেশের অনেক দিক অস্পষ্ট উল্লেখ করে রুশ প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি অবরোধ করলে তা বিশ্ববাজারের জন্য ক্ষতিকর হবে।
দুপক্ষকে আবার বসাতে চায় পাকিস্তান
পাকিস্তানের দ্য নিউজ–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর দুই পক্ষকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে পাকিস্তান সর্বাত্মক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু করেছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ গতকাল বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত নিরসনে এখনো প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।…যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর আছে এবং কিছু অমীমাংসিত সমাধানে আমরা পূর্ণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’এদিকে গতকাল ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইসলামাবাদে বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর ইরান আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তেহরান ‘খুব মরিয়া হয়ে’ ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি চুক্তি করতে চায়। যদিও এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ইরানের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। যুদ্ধবিরতি ব্যাহত করে, এমন যেকোনো পদক্ষেপ দৃঢ়ভাবে বিরোধিতা করতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধবিরতিকে ‘অত্যন্ত নাজুক’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন
এ বিভাগের আরো খবর